ডায়াবেটিসের কারণ ও ঝুঁকি, সম্ভাব্য জটিলতা এবং প্রতিরোধে করণীয়
অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিনজনিত জটিলতা, বংশগত ইতিহাস, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অলস জীবনযাপন, মানসিক চাপ কিংবা ঘুমের অনিয়ম-সবকিছু মিলেই বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। এমনকি যাঁদের শরীরে এখনো লক্ষণ দেখা দেয়নি, তাঁদেরও কিছু নির্দিষ্ট কারণ থাকলে সতর্ক হওয়া দরকার। সময়মতো পরীক্ষা না করানো এবং ঝুঁকি অবহেলা করাই অনেককে ঠেলে দেয় দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদযন্ত্রসহ শরীরের নানা অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হলে মা ও শিশুর জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। তবে পূর্বসচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে টাইপ-২ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

ডায়াবেটিসের কারণ ও ঝুঁকি
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে বংশগত কারণ অনেকাংশে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। বংশগত, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতি কীভাবে ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে তা নিম্নে বর্ণনা করা হলোÑ
বংশগত : পরিবারের নিকটাত্মীয় যেমন বাবা-মা, ভাই-বোন ডায়াবেটিসের রোগী হলে অন্যদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তবে, পরিবারে কারো
ডায়াবেটিস না থাকলে অন্যদের হবে না-বিষয়টি তেমনও নয়। নারী ও পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস নেই, তাঁদের তুলনায় যে পরিবারে এই রোগের ইতিহাস রয়েছে সেখানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ : জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই আমরা কমবেশি মানসিক চাপের সম্মুখীন হই। ভয়, রাগ, হতাশা কিংবা কান্নাÑএসব আবেগের মধ্য দিয়ে মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কখনো কখনো অতিরিক্ত মানসিক চাপের প্রভাব শরীরেও পড়তে শুরু করে। দেখা দিতে পারে নানা রকম শারীরিক উপসর্গ যেমনÑ অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, হঠাৎ হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা ইত্যাদি। মানসিক চাপের প্রভাব রক্তে শর্করার মাত্রার ওপরও পড়ে। স্ট্রেস হরমোন, যেমনÑ কর্টিসল, শরীরে নিঃসৃত হলে তা হঠাৎ করেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ কেবল ডায়াবেটিস নয়, শরীরের অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। অপরদিকে, উদ্বেগ হলো মানসিক চাপেরই এক দীর্ঘস্থায়ী রূপ যেখানে মনে অকারণ ভয়, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগের হার সুস্থ মানুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে ডায়াবেটিসের মতো একটি রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা রোগীর কাছে একধরনের মানসিক চাপে পরিণত হয়। যা থেকে দেখা দেয় ক্লান্তি ও উদ্বেগ।
খাদ্যাভ্যাস : অতিরিক্ত মিষ্টিজাত, চর্বি ও ক্যালরিযুক্ত খাবার ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। অতিরিক্ত খাবার খাওয়া এবং অনিয়মিত খাওয়ার অভ্যাসও রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য নষ্ট করে।
জীবনধারা : স্বাভাবিক কোনো কাজকর্ম ছাড়াই শুয়ে-বসে কাটালে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও। দিনের অধিকাংশ সময় শুয়ে-বসে কাটালে ওজন বেড়ে যায়। এতে অবসাদ এবং বিষণ্ণতাও জেঁকে ধরে। মানসিক চাপ, অনিদ্রা বা অনিয়মিত ঘুমের মতো সমস্যা দেখা দেয়। আর ধীরে ধীরে এই সমস্যাগুলো ডায়াবেটিসের কারণ হয়।
ডায়াবেটিসের লক্ষণ না থাকলেও যাঁদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত
- বয়স ৪৫ বা তার বেশি হলে।
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলকায় ব্যক্তি।
- রক্তসম্পর্কীয় নিকট আত্মীয়ের মধ্যে ডায়াবেটিস থাকলে।
- যাঁরা শারীরিক পরিশ্রম করেন না এবং যাঁদের নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস নেই।
- প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে।
- নারী গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে কিংবা অধিক ওজনের সন্তান প্রসবের পূর্ব ইতিহাস থাকলে।
- উচ্চ রক্তচাপ থাকলে। স্ট্রোক হলে।
- রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি এবং এইচডিএলের মাত্রা কম থাকলে।
ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য জটিলতা
- ডায়াবেটিসের ফলে এলডিএল নামের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল বেড়ে যায় এবং এইচডিএল নামক ইতিবাচক কোলেস্টেরল কমে যায়। এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে ধমনির মধ্যে ফ্যাটি প্লাক জমতে শুরু করে এবং রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
- দীর্ঘ মেয়াদে ডায়াবেটিসের কারণে রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। যার ফলে রোগী স্ট্রোক এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
- কিডনির পরিশোধন কাজে ব্যবহৃত অংশ অনেকগুলো চিকন রক্তনালি দ্বারা পূর্ণ থাকে। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে এই চিকন রক্তনালিগুলো আরো সরু হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহের অভাবে কিডনি ক্রমেই বিকল হতে থাকে।
- ডায়াবেটিসের কারণে চোখের রক্তনালিগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ধীরে ধীরে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে।
- ডায়াবেটিসের ফলে পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পায়ে রক্ত চলাচল কমে যায়।
- ডায়াবেটিস বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
- ডিপ্রেশন এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে ডায়াবেটিস।
- গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে মায়ের গর্ভপাত, ঘন ঘন বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ, খিঁচুনি ও প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। আবার গর্ভের সন্তান বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। এমনকি মৃত সন্তান জন্ম নিতে পারে। তাছাড়া, প্রিম্যাচিউর শিশু এবং শিশুর অতিরিক্ত ওজনের কারণ হতে পারে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এসব শিশু পরবর্তীকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার অধিক ঝুঁকিতে থাকে।
প্রতিরোধে করণীয়
টাইপ-১ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায় না। তবে জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রি-ডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অনেকাংশে প্রতিরোধ এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে কিছু জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। যেমন :
- সুষম খাদ্য গ্রহণ করা: কম ক্যালরি এবং কম চর্বিযুক্ত খাবার খেতে হবে। ফাইবারযুক্ত খাবার বেশি বেশি খেতে পারেন। খাদ্যতালিকায় রাখুন ফল, শাক-সবজি এবং গোটা শস্য জাতীয় খাবার।
- ভারী কাজের অভ্যাস বা প্রয়োজন না থাকলে, অন্তত হালকা কোনো কাজের মাধ্যমে শরীরকে কর্মচঞ্চল রাখুন। শুয়ে-বসে দিন কাটাবেন না।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
- যাঁদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার বিভিন্ন ঝুঁকি রয়েছে, তাঁরা নিয়মিত বিরতিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন।
- যাঁদের ঝুঁকি কম তাঁদেরও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
- ঘন ঘন পিপাসা পাওয়া, প্রস্রাবের বেগ ঘন ঘন আসা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত বোধ করা, ক্ষত বা ঘা শুকাতে দেরি হওয়াসহ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

ডা. তানজিনা জান্নাত
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি)
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), মিরপুর, ঢাকা।