করোনা সংক্রমণে নিউমোনিয়ার প্রকোপ

অধ্যাপক মো: আলী হোসেন

নিউমোনিয়া- অতিপরিচিত এই রোগটি অত্যন্ত নিরীহ ধরনের মনে হয় আমাদের কাছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ; হুটহাট আক্রান্তও হয়ে থাকেন অনেকে। আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল মনে হলেও সময় বিশেষে অসুখটি ভয়ানক মরণঘাতী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসের ফলে সৃষ্ট নিউমোনিয়া ঠিক কতটা ভয়াবহ তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। তবে এ ধরনের নিউমোনিয়া যে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে থাকে এ ব্যাপারে গবেষকগণ নিঃসন্দেহ।

করোনাভাইরাস আমাদের দেহের যেকোনো অঙ্গকেই আক্রমণ করতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শ্বাসতন্ত্রের।

নিউমোনিয়া
ফুসফুসের সংক্রমণ ও প্রদাহজনিত বিভিন্ন জটিলতাই মূলত নিউমোনিয়া। ফুসফুস অনেকটা স্পঞ্জের মতো। ফুসফুসের কোষগুলো বাতাস দিয়ে ভর্তি থাকে। সংক্রমণের ফলে সেখানে পুঁজ বা ফ্লুয়িড জমে যায়। তখন ধীরে ধীরে ফুসফুস কঠিন হতে শুরু করে। স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না। দেহের ভেতর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এই অবস্থাকেই নিউমোনাইটিস বা
নিউমোনিয়া বলা হয়।

নিউমোনিয়ার ধরন, কারণ ও করোনাভাইরাস সংক্রমণ
বিভিন্ন ধরনের নিউমোনিয়া রয়েছে। যেমন, কমিউনিটি অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া। পরিবেশে বিদ্যমান জীবাণুর সংক্রমণের ফলে এ ধরনের নিউমোনিয়া হয়ে থাকে।
এছাড়া রয়েছে হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া, ভেন্টিলেটর অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়া এবং অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া। খাবার সময় সরাসরি ফুসফুসে খাবার, পানি বা অন্যান্য পানীয় ফুসফুসে ঢুকে গিয়ে অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া হয়ে থাকে।
সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ফাঙ্গাসজনিত কারণে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। এখন করোনাভাইরাসের আক্রমণ নিউমোনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস আমাদের দেহের যেকোনো অঙ্গকেই আক্রমণ করতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শ্বাসনালির।
করোনাভাইরাস দ্বারা শ্বাসনালির নিচের অংশ অর্থাৎ ফুসফুস আক্রান্ত হলে তাকে কোভিড নিউমোনিয়া বলা হয়।

সাধারণ নিউমোনিয়া ও কোভিড নিউমোনিয়া
– সাধারণ নিউমোনিয়া ফুসফুসের একটি অংশকে সংক্রমিত করে। কিন্তু কোভিড নিউমোনিয়া ফুসফুসের বৃহৎ জায়গাজুড়ে আক্রান্ত করে। ফুসফুসের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি কোভিড নিউমোনিয়া একই সঙ্গে দুটি ফুসফুসের বিভিন্ন অংশকে সংক্রমিত করতে পারে।
– সাধারণ নিউমোনিয়ায় অ্যালভিওলাই বেশি আক্রান্ত হয়। কিন্তু কোভিড নিউমোনিয়ায় অ্যালভিওলাই এবং রক্তনালির মাঝখানের পর্দাটি আক্রান্ত হয়।
– সাধারণ নিউমোনিয়ায় বুকে কফ জমে এবং কাশির সঙ্গে কফ বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু কোভিডের ক্ষেত্রে কফ হয় না বললেই চলে। বরং শুকনো কাশি থাকে।
– সাধারণ নিউমোনিয়ায় বেশি জ্বর এবং বুকের সংক্রমিত স্থানে ব্যথা হয়ে থাকে। অন্যদিকে কোভিড নিউমোনিয়ায় জ্বরের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়।
– সাধারণ নিউমোনিয়া সংক্রমণ করে খুব দ্রæত এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তীব্রতায় রূপ নেয়। কিন্তু এ বছর জানুয়ারিতে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে দেখা যাচ্ছে, কোভিড নিউমোনিয়া ফুসফুসের বিভিন্ন অংশে ছড়াতে থাকে খুব ধীরগতিতে কিন্তু রেখে যায় দীর্ঘমেয়েদি ক্ষতি। কিডনি, ব্রেইন, হৃদযন্ত্র এবং দেহের অন্যান্য প্রত্যঙ্গকেও দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কোভিড নিউমোনিয়া কীভাবে বুঝবেন
কোভিড নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে অবশ্যই জ্বর থাকবে। সেই সঙ্গে থাকবে নিম্নোক্ত উপসর্গসমূহ-
– শরীর ব্যথা
– গলাব্যথা
– শ্বাসকষ্ট
– হৃদগতি বৃদ্ধি
– শ্বাসের গতি বৃদ্ধি
– প্রচুর ঘাম
– বুকের অ্যালভিওলার শ্বাস শব্দের পরিবর্তন
– দুর্বলতা
– শুকনো কাশি
– ক্ষুধামান্দ্য
– মাথাব্যথা
– পেটব্যথা
– বমি বমি ভাব
– পাতলা পায়খানা

কোভিড নিউমোনিয়ায় যারা আক্রান্ত হতে পারেন-
যেকোনো বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে নিম্নোল্লিখিত ব্যক্তিগণ অধিক ঝুঁকিতে রয়েছেন।
– ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি।
– অ্যাজমার রোগী।
– ব্রঙ্কাইটিস, ইন্টারস্টিসিয়াল লাং ডিজিজের মতো ফুসফুসের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
– ডায়াবেটিসের রোগী।
– হার্টের রোগী।
– উচ্চ রক্তচাপের রোগী।
– স্থ‚ল ব্যক্তি; যাদের বডি মাস ইনডেক্স ৪০ এর বেশি।
– ধূমপায়ী বা অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণকারী ব্যক্তি।
– স্বাস্থ্যকর্মী; যারা সরাসরি কোভিড-১৯ নিউমোনিয়া রোগীদের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত।

চিকিৎসা ও করণীয়
কোভিড নিউমোনিয়া নিরাময়ের কার্যকর কোনো চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকগণ ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। কারো ভেতর উপসর্গগুলো দেখা গেলে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা জরুরি।
– যথাসম্ভব দ্রুত পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা।
– সংক্রমণের উৎস খুঁজে বের করা।
– কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ করা।
– রোগীকে হাসপাতালে আলাদা করে সাপোর্টিভ কেয়ার প্রদান করা।

অধ্যাপক মো: আলী হোসেন
এম.বি.বি.এস, এফ.সি.পি.এস (মেডিসিন), এমডি (চেস্ট)
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও পালমনোলজিস্ট
সিনিয়র কনসালট্যান্ট (রেসপিরেটরি মেডিসিন)
ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি ঢাকা

LinkedIn
Share
WhatsApp