শীতকালে অ্যাজমা: রোগীদের সতর্কতা ও করণীয়

ডা. মো. সাইদুল ইসলাম

অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের জন্য শীতকাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋতু। এ সময় শিশুদের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ এবং বড়োদের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ হাঁপানির তীব্রতা বেড়ে যায়। এদিকে সারা বিশ্বে হাঁপানি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বাংলাদেশেও। গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমার (গিনা) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় ৩৪ কোটি হাঁপানি রোগী রয়েছে। আর সারা বিশ্বে হাঁপানির কারণে প্রতিদিন মারা যায় প্রায় ১ হাজার মানুষ। হাঁপানির সঙ্গে এখন আবার যোগ হয়েছে কোভিড-১৯। ফলে এই শীতে এ রোগে আক্রান্তদের সচেতন হতেই হবে।

অ্যাজমা বা হাঁপানি

শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ অ্যাজমা বা হাঁপানি। প্রদাহের ফলে শ্বাসনালির মধ্যে কফের নিঃসরণ বেড়ে যায় এবং শ্বাসতন্ত্রের পেশি সংকুচিত হয়ে যায়। দেহে পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবেশ করতে পারে না। দেহ অক্সিজেন-সংকটে পড়ে নানা রকম জটিলতার মুখোমুখি হয়। শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকের মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ, বুকে চাপ ইত্যাদি সমস্যা রোগীকে যথেষ্ট ভুগিয়ে থাকে। রোগটি দীর্ঘমেয়াদি। একবার আক্রান্ত হলে বহুদিন পর্যন্ত কষ্ট করতে হয়।

অ্যাজমার লক্ষণ

  • দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট
  • ঋতু পরিবর্তনের সময় শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া
  • বুকে চাপ অনুভূত হওয়া
  • কাশি/ শুকনো কাশি
  • শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বুকে বাঁশির মতো সাঁ সাঁ শব্দ
  • হঠাৎ দমবন্ধ লাগা
  • নাকে-মুখে ধুলোবালি গেলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া

অ্যাজমার কারণ

সুনির্দিষ্ট করে অ্যাজমা বা হাঁপানির কারণ বলা মুশকিল। তবে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অ্যাজমা রোগের উৎপত্তি ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে দায়ী।

  • বংশগত।
  • পশুর লোম, আরশোলা, ফুলের রেণু, ছত্রাক প্রভৃতি।
  • বায়ুদূষণ, সিগারেটের ধোঁয়া, কারখানার বিভিন্ন উত্তেজক পদার্থ, রঙের ঝাঁজালো গন্ধ, ঝাঁজালো মসলা প্রভৃতি।
  • বিভিন্ন ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যাসপিরিন হেরোইন প্রভৃতির অতি ব্যবহার।
  • মানসিক চাপ, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা।

বিশ্বে প্রায় ৩৪ কোটি হাঁপানি রোগী রয়েছে।
সারা বিশ্বে হাঁপানির কারণে
প্রতিদিন মারা যায় প্রায় ১ হাজার মানুষ।

শীতে অ্যাজমা বেড়ে যাওয়ার কারণ

স্বাভাবিকভাবেই ঋতু পরিবর্তনের সময় হাঁপানি রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। শীতকালে ঠান্ডা-শুষ্ক আবহাওয়ার পাশাপাশি আরো কিছু কারণে অ্যাজমার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। যেমন-

  • শীতে আবহাওয়ার তাপমাত্রা দ্রুত ওঠা-নামা করে থাকে।
  • ঠান্ডা-শুষ্ক বাতাসের ফলে শ্বাসতন্ত্র সংকুচিত হয়।
  • এ সময় জ্বর, সর্দি-কাশি, বিভিন্ন ভাইরাস ও ফ্লুর প্রকোপ বেড়ে যায়।
  • বাতাসে উড়ন্ত ধুলোবালির পরিমাণ বেড়ে যায়।
  • শীতের শিশির, কুয়াশা শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে।

শীতকালে অ্যাজমা রোগীদের করণীয়

  • এ সময় বাতাসে ধুলোবালি, উড়ন্ত ফুলের রেণু, কণা বেশি থাকে। ফলে বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক পরে নেবেন।
  • মাফলার, টুপি, হাতে পায়ে মোজা এবং গায়ে গরম কাপড় রাখবেন। খালি পায়ে হাঁটবেন না।
  • বাড়িতে ইনহেলার, নেবুলাইজার এবং অন্যান্য প্রাথমিক ওষুধ রাখবেন। এসবের মেয়াদ আছে কি না, তা অবশ্যই লক্ষ রাখবেন।
  • করোনার টিকা নিয়ে না থাকলে দ্রুত টিকা নিয়ে নেবেন।
  • বয়স্কদের জন্য বয়স্ক টিকা বা অ্যাডাল্ট ভ্যাকসিনেশন জরুরি। প্রতিবছর শীত শুরুর আগে একটি করে ফ্লু ভ্যাকসিন নিলে হাঁপানি রোগী শীতে অনেক ভালো থাকবেন।
  • শোবার ঘরে অতিরিক্ত মালামাল রাখবেন না। জিনিসপত্র ঢেকে রাখবেন, যাতে ধুলোবালি না ওড়ে।
  • ধূমপানের অভ্যাস থাকলে দ্রুত পরিহার করুন।

অ্যাজমার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

পাইরোমেট্রি বা পিক ফ্লো মেট্রি পরীক্ষা: রোগীর শ্বাসনালিতে শ্বাস গ্রহণে বাধা আছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য এটি করা হয়।

মেথাকলিন চ্যালেঞ্জ পরীক্ষা: এর মাধ্যমে শ্বাসনালির অতি সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা হয়।

রক্ত পরীক্ষা: শ্বাসনালিতে ইয়োসিনোফিল ও অন্যান্য নানা কোষীয় উপাদান জমা হয়ে শ্বাসনালি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। রক্তে ও কফে এই ইয়োসিনোফিল ও সিরাম আইজিইয়ের মাত্রা বেশি আছে কি না, তা নির্ণয় করা হয়।

স্কিন প্রিক টেস্ট: অ্যালার্জেন বা ট্রিগার পরীক্ষার জন্য এই টেস্ট করা হয়। এর মাধ্যমে সামান্য পরিমাণ অ্যালার্জেন রোগীর ত্বকের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

অ্যালার্জি প্যানেল টেস্ট: বর্তমানে অ্যালার্জি প্যানেল টেস্টের মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষা করে অ্যাজমা রোগীর কোন কোন জিনিসে অ্যালার্জি আছে, তা সহজেই শনাক্ত করা যায়।

অ্যাজমার ক্ষেত্রে খাবারের ভূমিকা

ব্যক্তিবিশেষে খাবারের ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে। গরুর মাংস, চিংড়ি মাছ খেলে কারো কারো অ্যাজমার সমস্যা হয়। আবার কারো ক্ষেত্রে বেগুন খেলে সমস্যা হয়। সাধারণত বেগুন, পুঁইশাক, চিংড়ি, ইলিশ মাছ, গরুর মাংস, পাকা কলা, হাঁসের ডিম ইত্যাদি খাবার অ্যাজমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অ্যাজমা রোগীদের জন্য উপকারী খাবার

খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে অ্যাজমা রোগীদের অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। অ্যাজমা রোগীদের জন্য শাক-সবজি খুবই উপকারী। এখন শীতকাল চলছে। প্রচুর শাক-সবজি পাওয়া যায় এ সময়। এ ছাড়া গাজর, আপেল, ব্রকলি, আদা, রসুন, মধু, আদা চা হাঁপানি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।


ডা. মো. সাইদুল ইসলাম

এমবিবিএস, ডিটিসিডি, এমডি (চেস্ট), এফআরসিপি (গ্লাসগো)
এক্স কনসালট্যান্ট, পালমোনারি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন
কিং সাউদ হাসপাতাল (কেএসএ)
মেডিসিন, অ্যাজমা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক (রেসপিরেটরি মেডিসিন)
পরিচালক, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল মহাখালী, ঢাকা
কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল।


Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

LinkedIn
Share
WhatsApp