ইনসুলিন ও ওষুধ প্রয়োজন কখন

ইনসুলিন ও ওষুধ প্রয়োজন কখন

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করাটা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় মুখে খাওয়ার ওষুধে কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণ না এলে ইনসুলিনের প্রয়োজন পড়ে। আবার কারও ক্ষেত্রে শুরু থেকেই ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসার ধরন নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং জটিলতার ঝুঁকি সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। রোগীর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইনসুলিন ও ওষুধ কোনটা কখন প্রয়োজন-সেই সিদ্ধান্ত নেবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

ইনসুলিন কখন প্রয়োজন হয়

টাইপ-১ ডায়াবেটিস :

একজন সুস্থ মানুষের শরীরে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ থেকে স্বাভাবিকভাবে ইনসুলিন উৎপন্ন হয়। কিন্তু বংশগত ও পারিপার্শ্বিক কারণ এবং একধরনের ইমিউন সিস্টেম (রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা) জটিলতায় অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইনসুলিন উৎপাদনের ক্ষমতা হ্রাস পায়। ধীরে ধীরে এর উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। ফলে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে ইনসুলিন গ্রহণের কোনো বিকল্পই থাকে না। এমনকি, ইনসুলিন না নিলে রক্তে সুগারের পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস :

অগ্ন্যাশয় যদি পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয় কিংবা উৎপন্ন ইনসুলিন শরীরে ঠিকভাবে কাজ না করে-সেই অবস্থাকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বলা হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো দেহের কোষে গ্লুকোজ পৌঁছে দেওয়া, এসব গ্লুকোজ ব্যবহার করে কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিন উৎপন্ন না হলে কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিন শরীরে ঠিকভাবে কাজ না করলে, গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে পারে না। এগুলো তখন রক্তে অবস্থান করে এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন এবং মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তবে, চিকিৎসার কোনো পর্যায়ে যদি মুখে খাওয়ার ওষুধ কাজ না করে এবং ডায়াবেটিসের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় তখন রোগীকে ইনসুলিন দিতে হয়। যেসব ক্ষেত্রে ইনসুলিন প্রয়োজন হয়Ñ

  • রক্তে শর্করার মাত্রা খালি পেটে ১৪ মিলিমোল এবং খাবারের দুই ঘণ্টা পর ১৮ মিলিমোলের বেশি থাকলে চিকিৎসায় ইনসুলিন প্রয়োজন হয়।
  • এইচবিএওয়ানসি টেস্টে তিন মাসের ডায়াবেটিসের গড় ১০ শতাংশের বেশি হলে তখন ওষুধের বদলে ইনসুলিন দিতে হয়।
  • মুখে খাওয়ার ওষুধের ডোজ সম্পূর্ণ করার পরও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না এলে।
  • ডায়াবেটিসের রোগীর গুরুতর কোনো শারীরিক জটিলতা যেমন- হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, তীব্র মাত্রার প্রদাহ বা সংক্রমণ, জন্ডিস, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া কিংবা পায়ে ঘা দেখা দিলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ওষুধের বদলে ইনসুলিন প্রয়োজন হয়।
  • কোনো সার্জারি বা অস্ত্রোপচারে আগে ও পরে ডায়াবেটিস রোগীর ইনসুলিনের প্রয়োজন হতে পারে।
  • ডায়াবেটিসের রোগী দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ ও কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হলে তখন ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ইনসুলিন প্রয়োজন হয়।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস

গর্ভকালীন বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে রোগীদের জন্য ইনসুলিন সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শে শুধু ইনসুলিন ব্যবহার করা যেতে পারে। ডায়াবেটিসের অন্যান্য ওষুধ এ সময় না খাওয়া ভালো। মুখে খাওয়ার কিছু ওষুধ শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

মুখে খাওয়ার ওষুধের ব্যবহার

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে সাধারণত মুখে খাওয়ার ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে ইনসুলিন একমাত্র ভরসা।

তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে মাত্রা কম থাকলে মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করা যায়।

যেসব ক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়-

  • ডায়াবেটিসের মাত্রা যদি কম থাকে, তাহলে মেটফরমিন ও সালফোনাইল ইউরিয়া-জাতীয় খাওয়ার ওষুধ উপকারে আসে।
  • কম মাত্রার ডায়াবেটিসে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। জীবনযাত্রার এমন ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও যদি ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়ে, তখন ওষুধের প্রয়োজন হয়।

  • ঘন ঘন প্রস্রাব, অত্যধিক তৃষ্ণা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া এবং ক্লান্তিবোধসহ ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে প্রাথমিক অবস্থাতেই ওষুধের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

এইচবিএওয়ানসি টেস্টে রক্তে উপস্থিত শর্করার গড় মান ৫.৭% থেকে ৬.৪%-এর মধ্যে থাকলে সেই অবস্থাকে বলা হয় প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা। এ সময় জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করলে ডায়াবেটিসের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

অনেকের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, ইনসুলিন গ্রহণ করা শুরু করলে বাকি জীবন ইনসুলিন নিতেই হবে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মাত্রা কমিয়ে আনার পর পুনরায় মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা যায়।


ডা. এম সাইফুদ্দিন

ডা. এম সাইফুদ্দিন

এমবিবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (এন্ডে ক্রাইনোলজি) বারডেম, এফআরসিপি (লন্ডন),
এফআরসিপি (এডিন), এফআরসিপি (গ্লাসগো), এফআরসিপি (আয়ারল্যান্ড), এফএসিই (ইউএসএ),
এফএসিপি (ইউএসএ), কোর্স ইন অ্যাডভান্স এন্ডোক্রাইনোলজি (সিঙ্গাপুর, মায়ো ক্লিনিক ইউএসএ)
অ্যাডভান্স ট্রেনিং (হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল)
সহযোগী অধ্যাপক, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা


LinkedIn
Share
WhatsApp