কিডনি ও ডায়াবেটিস
বেঁচে থাকার জন্য মানবশরীরের অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের নাম কিডনি। এটি অত্যন্ত চিকন ও সূক্ষ্ম রক্তনালির জালি দিয়ে তৈরি। এর কাজ হলো রক্ত পরিশোধন করা এবং বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেওয়া। শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতেও এটি সহযোগিতা করে থাকে। তবে কিডনির এ ছাঁকনিগুলো ঠিকমতো কাজ করতে না পারলে বর্জ্যগুলো রক্তের মধ্যেই থেকে যায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অর্থাৎ অনেক দিন যাবৎ রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজ এই জালিগুলোকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। ফলে কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পেতে থাকে এবং কিডনি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।

ডায়াবেটিস যেভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে
- কিডনির পরিশোধন কাজে ব্যবহৃত অংশ অনেকগুলো চিকন রক্তনালি দ্বারা পূর্ণ থাকে। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে এই চিকন রক্তনালিগুলো আরো সরু হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহের অভাবে কিডনি ক্রমেই বিকল হতে থাকে। যার ফলে অ্যালবুমিন প্রস্রাবের সঙ্গে বের হতে শুরু করে।
- ডায়াবেটিসের ফলে শরীরের নার্ভগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়। এই নার্ভগুলোর কাজ হলো মস্তিষ্কের সঙ্গে মূত্রথলিসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা কিংবা সংকেত পাঠানো। যেমন মূত্রথলি পূর্ণ হয়ে গেলে এই নার্ভগুলো মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে এই নার্ভগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রস্রাবের চাপ অনুভব করতে পারে না। তখন অতিরিক্ত ভরাট মূত্রথলি কিডনিকে প্রভাবিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- আবার দীর্ঘসময় মুত্রথলি প্রস্রাবে পূর্ণ থাকলে তাতে সংক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার কারণে ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন দেখা দেয়। কখনো কখনো এটিও কিডনি রোগের কারণ হয়।
- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগীদের শতকরা ৪০ ভাগেরই ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হতে থাকে। তবে এটি খুব দ্রুত ঘটে ব্যাপারটি তেমনও নয়।
ডায়াবেটিস ধরা পড়ার ৫ থেকে ৭বছরের মধ্যে প্রস্রাবের সঙ্গে অ্যালবুমিন নির্গত হতে শুরু করে। প্রথমে অল্প মাত্রায় ও পরে আরও বেশি মাত্রায় অ্যালবুমিন নির্গত হয়। তবে শুরুতেই যদি রোগ নির্ণয় করা যায়, তাহলে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি বিকল হওয়া থেকে রোধ করা সম্ভব হয়। চিকিৎসা না নিলে পরে ক্রিটিনিনসহ অন্যান্য দূষিত পদার্থগুলো রক্তে জমতে শুরু করে। যা ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে চলে যায় যখন কিডনি শরীরের বর্জ্য পদার্থগুলো আর বের করতে পারে না। তখন ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে কিডনির কাজ কৃত্রিমভাবে করানো ছাড়া রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।
কীভাবে বুঝবেন কিডনির ক্ষতি হয়েছে
শতকরা ৮০ শতাংশ কিডনি রোগী শুরুতে বুঝতেই পারেন না যে তাদের কিডনি অকেজো হয়েছে। যখন বুঝতে পারেন তখন তাদের দুটো কিডনিই মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তাই কিডনি রোগকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। তবে কিডনি রোগের লক্ষণগুলো জানা থাকলে শুরুতেই রোগ নির্ণয় এবং সুচিকিৎসা পাওয়া সহজ হয়। কিডনি রোগের লক্ষণগুলো হলো-
- পা ফুলে যায়/পায়ে পানি আসে
- ক্ষুধা কমে যায়
- বমি বমি ভাব হয়, এমনকি ঘন ঘন বমিও হতে পারে।
- শারীরিক দুর্বলতা ও অবসন্নতা
- শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
- দিনের তুলনায় রাতে প্রস্রাব বেশি হয়।
- শ্বাসকষ্ট হয়।
ডায়াবেটিসের রোগী ছাড়াও আরো কারা কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছেন
- যাঁরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
- যাঁদের পরিবারে কিডনি রোগী রয়েছে।
- যাঁদের অতিরিক্ত ওজন।
- যাঁরা ধূমপান ও মদপান করেন
- যাঁদের কিডনিতে পাথর রয়েছে।
- বয়স্ক ব্যক্তি।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ও তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণকারী।
ডায়াবেটিস রোগীদের কিডনি সুরক্ষায় করণীয়
- রক্তে শর্করার মাত্রা যেন কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- নিয়মিত রেনাল টেস্টের মাধ্যমে কিডনির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে নিতে হবে।
- একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা বানিয়ে নিতে পারেন। কিডনির জন্য ক্ষতিকারক খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন।
- রক্তচাপ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- ধূমপান ও মদপানের অভ্যাস থাকলে তা দ্রুত পরিহার করুন।
- যেকোনো ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন। স্বাস্থ্যের অবনতি হলে অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে আসুন এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
এমবিবিএস (ডিইউ), এমডি (নেফ্রোলজি)
সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, নেফ্রোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
সিনিয়র কনসালট্যান্ট
চেম্বার: ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা