গর্ভকালীন ডায়াবেটিস : মা ও শিশুর যত্ন
গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের বেশির ভাগই স্বাভাবিক হলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা জটিলতা তৈরি করতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস তেমনই একটি বিপাকজনিত জটিলতা, যা গর্ভবতী নারী ও তাঁর অনাগত সন্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে অনেক সময় গর্ভবতী মায়ের শরীরে উচ্চরক্তচাপ দেখা দেয়, কখনো জন্ম নেয় স্থূলকায় শিশু। আবার, অনেক সময় শুধু ডায়াবেটিসের কারণেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান প্রসবে সৃষ্টি হয় জটিলতা। এসব সমস্যা এড়িয়ে যেতে হলে গর্ভকালীন পুরোটা সময় সাবধানতা অবলম্বন করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা অতি জরুরি। সাধারণত সন্তান প্রসবের পর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ঠিক হয়ে যায়।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী
আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামক হরমোন রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু গর্ভাবস্থায় অন্যান্য হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিন হরমোনের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পর্যাপ্ত ইনসুলিনের অভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস দেখা দেয়, যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বলা হয়। গর্ভাবস্থার যেকোনো ধাপে এই ডায়াবেটিস হতে পারে। তবে, ২য় বা ৩য় ত্রৈমাসিক অর্থাৎ ৪র্থ থেকে ৯ম মাসের সময় এটি বেশি হতে দেখা যায়।
যেসব কারণে হতে পারে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন-
- ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস।
- প্রি-ডায়াবেটিস।
- বেশি বয়সে গর্ভধারণ।
- আগের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়া।
- আগে কখনো গর্ভপাত হওয়া।
- গর্ভবতী মায়ের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম কিংবা অন্য কোনো ইনসুলিনজনিত সমস্যা থাকা।
- পূর্ববর্তী গর্ভধারণে অতিরিক্ত ওজনের বাচ্চা জন্ম দেওয়া।
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা।
- উচ্চ রক্তচাপ।
লক্ষণ ও উপসর্গ
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সাধারণত বিশেষ কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেক বেড়ে গেলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমনÑঘন ঘন পিপাসা পাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত বোধ করা এবং আগের তুলনায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে ওরাল গ্লকোজ টলারেন্স টেস্টের (ওজিটিটি) মাধ্যমে ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং জরুরি।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের জটিলতা
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না আনলে মা ও গর্ভের শিশু উভয়ের ক্ষেত্রেই কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের যে সমস্যাগুলো হতে পারে

- গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে মায়ের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক সময় এই উচ্চ রক্তচাপ প্রি-এক্লাম্পসিয়া নামক একটি জটিল অবস্থায় রূপ নিতে পারে। যার ফলে শরীর ফুলে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা এবং কখনো কখনো খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না করা হলে এটি মা ও শিশু উভয়ের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
- গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিংবা ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজন হলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রসবের সম্ভাবনা কমে যায়। সেক্ষেত্রে সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা প্রসবের প্রয়োজন হতে পারে। তবে বাচ্চার ওজন স্বাভাবিক হলে এবং আগের গর্ভধারণে সিজার করা না হলে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ও প্রসবের চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই একজন শিশুবিশেষজ্ঞ উপস্থিত থাকা জরুরি।
- প্রথমবার গর্ভধারণে ডায়াবেটিস হলে, পরবর্তী গর্ভধারণেও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শিশুর ক্ষেত্রে জটিলতা
- অনেক সময় গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিসের কারণে বাচ্চার ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হয়। ওজন বৃদ্ধির কারণে বাচ্চার আকারও বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়ের গর্ভের শিশু অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই বা অপরিণত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে।
- শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিলে তার ফুসফুস পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- অনেক সময় জন্মের পরপরই শিশুর শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গিয়ে খিঁচুনি শুরু হতে পারে, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে।
- গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে শিশুর স্থূলতা দেখা দিতে পারে। এমনকি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তাদের অনেক বেড়ে যায়।
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে করণীয়
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে গর্ভবতী মা ও অনাগত শিশুর সুস্থতার জন্য একটু বাড়তি যত্ন ও সতর্কতা প্রয়োজন। এ সময় সঠিক নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করলে ডায়াবেটিস সহজেই নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং একটি সুস্থ গর্ভধারণ ও প্রসব নিশ্চিত হবে। এ জন্য সবার আগে গর্ভবতী মায়ের সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যতালিকায় শর্করাজাতীয় খাবার যেমন- ভাত, আলু ইত্যাদির পরিমাণ কমিয়ে সবজি ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করতে হবে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা যাবে না। দিনে অন্তত পাঁচবার খেতে হবে।
পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে সকাল-বিকেল কিছু সময় হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। এছাড়া, সপ্তাহে কমপক্ষে ৩ দিন খাওয়ার আগে এবং প্রতিবার খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে গ্লুকোমিটারের সাহায্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। যদি খালি পেটে শর্করার মাত্রা ৬ এবং খাওয়ার পর মাত্রা ৭-এর মধ্যে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের পরেও যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করার প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি এই অবস্থায় মানসিক চাপমুক্ত থাকা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং বিশ্রাম গ্রহণ খুবই জরুরি। এসব নিয়ম মেনে চললে সহজেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে, গর্ভের শিশুর বিকাশ স্বাভাবিক হবে এবং প্রসবকালীন জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

ডা. সেরাজুম মুনিরা
এমবিবিএস, বিসিএস, এফসিপিএস (গাইনি অ্যান্ড অবস), এমসিপিএস (গাইনি অ্যান্ড অবস্)
এফসিপিএস (রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজি ও ইনফার্টিলিটি), ট্রেনিং ইন এআরটি (আইএফভি), ইন্ডিয়া
প্রসূতি, স্ত্রীরোগ, রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট
ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ, আইভিএফ স্পেশালিস্ট ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন
প্রাক্তন কনসালট্যান্ট, রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রাক্তন কনসালট্যান্ট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল