টাইপ-১, টাইপ-২ ও জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস
জুভেনাইল ডায়াবেটিসে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের ডায়াবেটিসে শুরুতে এর তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। আবার গর্ভকালীন নারীদের যেই ডায়াবেটিস হয়, তা গর্ভধারণ করার প্রথম তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে লক্ষণ দেখা দেওয়া শুরু করে। ডায়াবেটিসের ধরন যেটাই হোক, শুরুতেই রোগ নির্ণয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে জোর দিলে ডায়াবেটিস নিয়েও ভালো থাকা যায়। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস চিকিৎসাবিহীন থাকলে কিডনি, লিভার ও চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ত্বক ও চুলসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর পড়ে ক্ষতিকর প্রভাব। তবে নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা জেনে, সে অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করলে এবং জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিস
সাধারণত শিশুরা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হয়। তবে এটি বড়দেরও হতে পারে। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ থেকে স্বাভাবিকভাবে ইনসুলিন উৎপন্ন হয়। কিন্তু বংশগত এবং পারিপার্শ্বিক কারণে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে, একধরনের ইমিউন সিস্টেম (রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা) জটিলতায় অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইনসুলিন উৎপাদনের
ক্ষমতা হ্রাস পায়। ধীরে ধীরে এর উৎপাদনক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়। ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, শিশুদের ক্ষেত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় এমন সমস্যা দেখা দেওয়া, ক্ষুধার মাত্রা বেড়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, ক্লান্তি ও দুর্বলতা এবং চোখে ঝাপসা দেখাসহ নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয় টাইপ-১ ডায়াবেটিসে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস
এ ধরনের ডায়াবেটিস প্রাপ্তবয়স্কদের ও বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। তবে শিশুদের কেউ কেউ এতে আক্রান্ত হলেও সংখ্যায় তেমন বেশি না। সাধারণত এ ধরনের ডায়াবেটিসে শুরুতে লক্ষণ প্রকাশ পায় না। নীরবে দেহের অভ্যন্তরে নানা ধরনের জটিলতা বাড়িয়ে তোলে। এতে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। যাঁদের ওজন বেশি, কায়িক পরিশ্রম করেন না এবং পরিবারে ডায়াবেটিসের রোগী আছে-তাঁদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অগ্ন্যাশয় যদি পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে ব্যর্থ হয় কিংবা উৎপন্ন ইনসুলিন শরীরে ঠিকভাবে কাজ না করে-সেই অবস্থাকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বলা হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো দেহের কোষে গ্লুকোজ পৌঁছে দেওয়া, এসব গ্লুকোজ ব্যবহার করে কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিন উৎপন্ন না হলে কিংবা উৎপাদিত ইনসুলিন শরীরে ঠিকভাবে কাজ না করলে, গ্লুকোজ কোষে পৌঁছাতে পারে না। এগুলো তখন রক্তে অবস্থান করে। এভাবে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ফলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। দীর্ঘ মেয়াদে রক্তনালি, কিডনি, লিভার ও চোখসহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অসুখের কারণ হয় ডায়াবেটিস।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘা কিংবা ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়া, প্রচণ্ড ক্লান্তি, হাত ও পায়ে ঝিমঝিম ভাব, বোগলের নিচে এবং ঘাড়ে কালো দাগসহ নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস
সাধারণত টাইপ-১ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারী গর্ভধারণের সময় এবং গর্ভধারণের পর নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। কিন্তু যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস ছিল না, তাঁরাও গর্ভকালীন এক ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। এ ধরনের ডায়াবেটিসকে বলা হয় জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সাধারণত কোনো বিশেষ লক্ষণ থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভকালীন চেকআপের সময় এটি ধরা পড়ে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে গর্ভধারণের তিন মাস পর থেকে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
যেমন: ঘন ঘন পিপাসা পাওয়া, প্রস্রাবের বেগ ঘন ঘন আসা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত বোধ করা, ক্ষত বা ঘা শুকাতে দেরি হওয়া। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের কারণে মায়ের গর্ভপাত, ঘন ঘন বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ, খিঁচুনি, প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। আবার গর্ভের সন্তান বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। এমনকি মৃত সন্তান জন্ম নিতে পারে। তাছাড়া, প্রিম্যাচিউর শিশু এবং শিশুর অতিরিক্ত ওজনের কারণ হতে পারে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এসব শিশু পরবর্তীকালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার অধিক ঝুঁকিতে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রেই সন্তান প্রসবের পর রক্তে গ্লুকোজ স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে সব ক্ষেত্রে এমনটি হয় না। জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের পরবর্তী ২০ বছরের মধ্যে শতকরা ৮০ জনের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়। তাই সন্তান জন্মদানের ৬ সপ্তাহ পরে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন এবং সুচিকিৎসা গ্রহণ করুন।

অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিম উদ্দিন
এমবিবিএস (ঢাকা), এফসিপিএস (এম), এফআরসিপি (গ্লাসগো), এফএসিপি (ইউএসএ)
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও বারডেম জেনারেল হাসপাতাল
ইন্টারনাল মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
চেম্বার: ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), ধানমন্ডি, ঢাকা