ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ ও ডায়াগনোসিস
দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছি অনেক আগেই। আর প্রতিনিয়তই হু হু করে বাড়ছে সে সংখ্যা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেক মানুষ জটিলতা বাড়ার আগে জানতেই পারেন না তাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে। কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও উদাসীনতা এবং অবহেলায় তাঁরা হাসপাতালে আসেন না। দীর্ঘমেয়াদে অনির্ণীত এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি, চোখ, হৃদযন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও জটিলতা তৈরি হয়। অথচ কিছু সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সময়মতো ডায়াবেটিস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণ
- ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া ও প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া।
- শিশুদের ক্ষেত্রে বিছানায় প্রস্রাব করা এবং বন্ধ হওয়ার পর, পুনরায় ঘুমের মধ্যে প্রস্রাব করা।
- অতিরিক্ত দুর্বলতা ও সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব।
- প্রচণ্ড পিপাসা ও ঘন ঘন ক্ষুধা লাগা।
- মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া।
- ওজন হ্রাস পাওয়া এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা কমে যাওয়া।
- কোথাও কেটে গেলে তার ক্ষত এবং ঘা শুকাতে বেশি সময় লাগা।
- শুষ্ক ত্বক ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া।
- অতিরিক্ত বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা।
কারা আছেন ঝুঁকিতে
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে অধিকাংশই স্বাস্থ্যসচেতনতায় উদাসীন থাকেন। এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার শুরুর দিকে তাঁদের অনেকের জানাই থাকে না যে তাঁরা ডায়াবেটিসে ভুগছেন। অথচ দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসাবিহীন ডায়াবেটিসের কারণে কিডনি রোগ, হৃদরোগসহ শরীরে দেখা দিতে পারে নানা জটিলতা। শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই জেনে রাখা ভালো কারা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার অধিক ঝুঁকিতে আছেন। যাঁদের মা-বাবা, ভাই-বোন এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস রয়েছে এবং যাঁরা নিয়মিত হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রম করেন না—তাঁদের এ রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির আধিক্য, স্থূলকায় ও হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও রয়েছেন অধিক ঝুঁকিতে।
এছাড়া, যেসব শিশুর ওজন বেশি এবং যাঁদের মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয়েছিল তাঁদেরও ডায়াবেটিসে বেশি ভুগতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণগুলো জানা থাকলে শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা যায়। এতে রোগ প্রতিরোধ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
ডায়াবেটিস শনাক্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
এইচবিএওয়ানসি টেস্ট: বর্তমান আধুনিক বিশ্বে ডায়াবেটিস নির্ণয়ের সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পদ্ধতির নাম এইচবিএওয়ানসি টেস্ট। এই পরীক্ষার মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে রক্তে উপস্থিত শর্করার গড় মান দেখা হয়। পরীক্ষায় প্রাপ্ত মান পাঁচের নিচে হলে তা স্বাভাবিক। কিন্তু, এইচবিএওয়ানসির মান ৬ দশমিক ৫ কিংবা এর বেশি হলে তা ডায়াবেটিস নির্দেশ করে। আর এটির মান ৫ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ৪-এর মধ্যে থাকলে সেই অবস্থাকে বলা হয় প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা। এই পরীক্ষার সুবিধা হলো, এটি দিনের যেকোনো সময় করা যায় এবং রক্তের নমুনা একবারই দিতে হয়।
ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (ওজিটিটি): ডায়াবেটিস নির্ণয়ে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা ওজিটিটি। এই পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস শনাক্ত করার জন্য দুইবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়। প্রথমত রোগীকে সকালে খালি পেটে একবার রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করা পরীক্ষা করতে হয়, তারপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ শরবত পান করার দুই ঘণ্টা পর আরেকবার রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা হয়। এতে রোগীর সময় কিছুটা বেশি ব্যয় হলেও, এ পরীক্ষায় নির্ভুলভাবে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা যায়। পরীক্ষায় শর্করার পরিমাণ প্রতি লিটারে ৭ দশমিক ৮ মিলিমোলের কম হলে তা শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা। কিন্তু গ্লুকোজ শরবত পান করার দুই ঘণ্টা পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা প্রতি লিটারে ১১ দশমিক ১ মিলিমোলের বেশি থাকলে তা ডায়াবেটিস বোঝায়। আর রক্তে শর্করার মাত্রা ৭ দশমিক ৮ থেকে ১১ মিলিমোলের মধ্যে হলে সেটি প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা।
র্যান্ডম ব্লাড সুগার টেস্ট: এ পদ্ধতিতে দিনের যেকোনো সময় রক্ত নিয়ে তা ল্যাবে পরীক্ষা করা যায়। এর জন্য দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার প্রয়োজন হয় না। ভরা পেটে থাকলেও পরীক্ষাটি করা যায়। রক্তে শর্করার পরিমাণ প্রতি লিটারে ১১.১ মিলিমোল কিংবা এর বেশি পাওয়া গেলে তা বোঝায় রোগীর ডায়াবেটিস রয়েছে।
ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ টেস্ট: সকালে খালি পেটে রক্ত নিয়ে এই পরীক্ষাটি করা হয়। পরীক্ষায় রক্তে শর্করার মাত্রা প্রতি লিটারে ৫ দশমিক ৬ মিলিমোল শনাক্ত হলে তা রক্তে শর্করার স্বাভাবিক অবস্থা। ৫ দশমিক ৬ মিলিমোল থেকে ৬ দশমিক ৯ মিলিমোলকে বলা হয় ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা। আর যদি ৭ মিলিমোল কিংবা এর বেশি হয় তাহলে বুঝতে হবে রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন।
যেকোনো বয়সী মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। ডায়াবেটিস হয়ে গেলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতার মুখেও পড়তে হয়। তবে শুরুতেই ডায়াবেটিস নির্ণয় করা গেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়েও ভালো থাকা যায়। ডায়াবেটিসজনিত যেকোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন এবং সুচিকিৎসা গ্রহণ করুন।

অধ্যাপক ডা. মোঃ রুহুল আমিন
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (ইএম বিএসএমএমইউ)
অধ্যাপক ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ
চেম্বার: ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।