ডায়াবেটিস ও খাদ্য : কী খাবেন, কী এড়াবেন
বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিস নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সাধারণত এ রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। তবে সুচিকিৎসা, সচেতনতা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ রেখে সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।

ডায়াবেটিস কী
ডায়াবেটিস একধরনের দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা তৈরি হওয়া ইনসুলিন শরীরে ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ (চিনির) পরিমাণ বেড়ে যায়। এটি মূলত দুই ধরনের হতে পারে :
টাইপ-১ ডায়াবেটিস : এটি সাধারণত শিশু বা কিশোরদের মধ্যে দেখা যায়। এ অবস্থায় ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস : সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। এক্ষেত্রে ইনসুলিন তৈরি হলেও তা কার্যকর হয় না।
তৃতীয় একটি ধরন হলো : জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (গর্ভকালীন ডায়াবেটিস)। এটি গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে বোঝায়। এটি মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস : কী খাবেন, কী খাবেন না
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সঠিক খাদ্যাভ্যাস। নিচে বিভিন্ন বয়স ও অবস্থার ভিত্তিতে খাদ্যাভ্যাস-সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো :

যা খাওয়া উচিত (সবার জন্য প্রযোজ্য) :
- শাকসবজি (পালংশাক, লাউ, মুলা, করলা, কুমড়া)।
- ডাল ও শস্যজাতীয় খাবার (সাদা চাল বাদ দিয়ে লাল চাল বা ব্রাউন রাইস)।
- উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার (ওটস, চিয়া সিডস, গোটা শস্য)।
- ফল (পেঁপে, আপেল, জাম, পেয়ারা পরিমিত পরিমাণ)।
- মাছ (বিশেষ করে চর্বিযুক্ত মাছ যেমন রুই, ইলিশ তবে সীমিত পরিমাণে খাবেন)।
- বাদাম ও বীজ (বাদাম, আখরোট, সূর্যমুখী বীজ)।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
যা এড়িয়ে চলা উচিত :
- চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার (মিষ্টি, কেক, চকলেট, মিষ্টিজাত পানীয়)।
- সাদা চাল, সাদা পাউরুটি।
- ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার।
- সোডা ও কোল্ড ড্রিংকস।
- অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার (সসেজ, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস)।
বয়স ও অবস্থাভেদে ডায়াবেটিস এবং রোগীদের খাদ্যাভ্যাস

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী :
- নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা ও শরীরচর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটুন।
- প্রতি বেলা পরিমিত খাবার খাওয়া উচিত; প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- রান্নায় পরিমিত তেল ব্যবহার করুন। চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণে সতর্ক থাকুন।
- খাদ্যতালিকায় প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন ডিমের সাদা অংশ, সয়াবিন এবং মাছ রাখুন।
গর্ভবতী নারী (জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস):

- রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখুন।
- একসঙ্গে বেশি খাবার না খেয়ে, ছোট ছোট ভাগে বারবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- বেশি করে ফল খেতে পারেন, তবে উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত ফল (কলা, আম) এড়িয়ে চলা ভালো।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার নয়।
শিশু ও কিশোরদের ডায়াবেটিস :
টাইপ-১ ডায়াবেটিস শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে শিশুর মা-বাবাকে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেমন-
- শিশুকে ইনসুলিন নেওয়ার নিয়ম-কানুন শেখাতে হবে।
- স্কুলে কিংবা বাইরে খেলাধুলা করার সময়ও খাবার ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনার দিকে অভিভাবকের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
- শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির দিকে খেয়াল রাখতে হবে, যেন সে নিজেকে আলাদা মনে না করে।
জীবনযাপন ও সতর্কতা
- প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন এবং হালকা ব্যায়াম করুন।
- স্ট্রেস কমিয়ে ফেলুন। এ ক্ষেত্রে মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম সহায়ক হতে পারে।
- রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- ধূমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করতে হবে।
ডায়াবেটিস নিরাময় করা না গেলেও এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণই পারে ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে।

কামরুন আহমেদ
সিনিয়র পুষ্টিবিদ
ল্যাবএইড হাসপাতাল