ডায়াবেটিস ও জটিলতা : কীভাবে প্রতিরোধ করবেন

ডায়াবেটিস ও জটিলতা : কীভাবে প্রতিরোধ করবেন

মানবদেহে ইনসুলিন নামক হরমোনের উৎপাদন বা কার্যক্রম ব্যাহত হলে ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগটির সৃষ্টি হয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকজনিত রোগ, যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এটি অনিয়ন্ত্রিত থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে চর্বি জমে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমনকি পায়ের ছোট একটি ক্ষতও গুরুতর সংক্রমণে রূপ নিতে পারে। তবে একটু সতর্কতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এসব জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ডায়াবেটিসজনিত স্বাস্থ্য জটিলতা

ডায়াবেটিসের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে-

হৃদরোগ

ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেসব কারণে ডায়াবেটিস হতে পারে যেমনÑ অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও মদ্যপানÑপ্রভৃতি বিষয়গুলো হৃদরোগের ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচিত হয়। ফলে একবার

যদি কেউ এই দু’টির কোনো একটি রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে অপরটির ঝুঁকিও অনেক গুণ বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এই অতিরিক্ত শর্করার কারণে রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে সরু হতে থাকে। এর ফলে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। হৃৎপিণ্ডে প্রয়োজনীয় রক্ত ও অক্সিজেন ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিস থেকে হৃদরোগ হওয়া এড়াতে মেনে চলুন এই বিষয়গুলো

  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করুন।
  • নিয়মিত রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন।
  • হৃদরোগের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন

কিডনির সমস্যা

ডায়াবেটিস অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি কিডনি রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে কিডনির পরিশোধন কাজে ব্যবহৃত চিকন রক্তনালিগুলো সরু হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহের অভাবে কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ সঠিকভাবে নিষ্কাশিত হয় না। ফলে শরীরে বর্জ্য জমে শরীর ফুলে যায়, প্রস্রাবের সঙ্গে অ্যালবুমিন নির্গত হয়, মূত্রনালিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হওয়া শুরু করে। তবে শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা গেলে কিডনির সমস্যা রোধ করা সম্ভব।

কিডনি ভালো রাখতে কী করবেন

  • রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • সুষম খাবার খান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
  • ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো ওষুধ সেবন করবেন না।
  • বছরে অন্তত একবার রেনাল টেস্টের মাধ্যমে কিডনির প্রকৃত অবস্থা জেনে নিন।

পায়ের জটিলতা

ডায়াবেটিসের কারণে পায়ের রক্তনালিগুলো ধীরে ধীরে সরু হয়ে যেতে পারে। এর ফলে রক্ত সঞ্চালন কমে গিয়ে পায়ের যেকোনো অংশ অবশ হয়ে যেতে পারে। ফলে পায়ে কোনো আঘাত লাগলে কিংবা ঘা ও ক্ষত হলে তা সহজে বোঝা যায় না এবং সেরে উঠতেও বেশ সময় লাগে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এসব ক্ষত ধীরে ধীরে আলসারে রূপ নিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, আক্রান্ত আঙুল বা পা কেটে ফেলতে হতে পারে।

ডায়াবেটিসের রোগীর পায়ের যত্ন

  • দুই পায়ে ঠিকমতো স্পর্শ, ব্যথা, ঠান্ডা-গরম ইত্যাদি অনুভূত হচ্ছে কি না কিংবা পায়ের কোনো অংশ অবশ হয়ে গেছে কি না, সে ব্যাপারে লক্ষ রাখুন।
  • পা, পায়ের পাতা, নখ ও আঙুলের ফাঁক নিয়মিত পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে।
  • চেষ্টা করবেন কোনো অবস্থাতেই খালি পায়ে না হাঁটতে।
  • যেসব ডায়াবেটিসের রোগীর পায়ে ইতিমধ্যে ক্ষত রয়েছে, তাঁদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি জুতা ব্যবহার করা উচিত যাতে নতুন করে ক্ষত না হয়।
  • প্রতিবছর অন্তত একবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পা পরীক্ষা করান।
  • পায়ে কোনো ধরনের ফোসকা, ক্ষত বা ঘা দেখা দিলে দেরি না করে ডায়াবেটিক ফুট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

দাঁত ও মাড়ির সমস্যা

ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, যার প্রভাব মুখগহ্বরেও পড়ে। ফলে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো দাঁত ও মাড়িও সহজেই আক্রান্ত হয়। মুখে জমে থাকা জীবাণু মাড়িকে দুর্বল করে তোলে, ফলে মাড়ি ফুলে যায় ও রক্তপাত শুরু হয়। ঠিকমতো যত্ন না নিলে এক পর্যায়ে দাঁতও নড়ে যেতে পারে। এতে অকালেই দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিসের রোগীর দাঁত ও মাড়ির যত্নে করণীয়

  • প্রতিদিন অন্তত দুইবার সঠিক নিয়মে কমপক্ষে দুই মিনিট সময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করুন।
  • দাঁতের পাশাপাশি মাড়ি ও জিহ্বাও ভালোভাবে পরিষ্কার রাখুন।
  • পান, তামাকজাত দ্রব্য ও ধূমপানের অভ্যাস পরিহার করুন।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি বছরে অন্তত দুইবার দাঁত ও মাড়ি পরীক্ষা করান।
  • দাঁত, মাড়ি বা জিহ্বায় যেকোনো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

চোখের ক্ষতি

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে চোখের ছোট ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা থেকে চোখে ছানি পড়া, গ্লুকোমা এবং ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি দেখা দেয়। এর ফলে চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ১২ বছর বা তার বেশি বয়সের সব ডায়াবেটিস রোগীকেই বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। সময়মতো সমস্যা শনাক্ত হলে চিকিৎসা অনেক বেশি কার্যকর হবে এবং চক্ষুজনিত যেকোনো জটিলতা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

চোখের ক্ষতি

স্নায়ুর ক্ষতি

দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসের প্রভাবে নার্ভ বা স্নায়ুর সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি নামে পরিচিত। এর ফলে শরীরে জ্বালাপোড়া, ব্যথা, অবশভাব ও ঝিমঝিম অনুভূতি দেখা দেয়, যা সাধারণত পায়ের আঙুল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। এ ধরনের উপসর্গ লক্ষ করলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ সময়মতো চিকিৎসা শুরু না করলে স্নায়ুর ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে এবং একপর্যায়ে কোনো অঙ্গের পেশিশক্তি চিরতরে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।


ডা. মারুফা মোস্তারী

ডা. মারুফা মোস্তারী

এমবিবিএস, এফসিপিএস (এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।


LinkedIn
Share
WhatsApp