ডায়াবেটিস ও মানসিক স্বাস্থ্য : উদ্বেগ, অবসাদ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি
ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপাকজনিত রোগ। বিশ্বব্যাপী এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কর্মব্যস্ত জীবনে ঘরে-বাইরে নানা রকম দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে ছন্দপতন। বাড়তে থাকে মানসিক চাপ। বংশগত ধারা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণেও ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। মানসিক চাপ শরীরে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এই দুই হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিন হরমোনের কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গিয়ে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। আবার ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও উদ্বেগে ভুগতে থাকেন। এর ফলে শুধু মানসিক স্বাস্থ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হলে ইনসুলিন, ওষুধ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

ডায়াবেটিস ও মানসিক জটিলতা
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকা অনেক রোগীই ধীরে ধীরে একধরনের মানসিক ক্লান্তি অনুভব করতে শুরু করেন। আগে যেসব কাজ করতে ভালো লাগত বা আনন্দ দিত, সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে নানা রকম মানসিক জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে। যেমন-
সম্পর্ক এবং নিজের শরীরের প্রতি যত্নের ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ যেমনÑনিয়মিত ওষুধ খাওয়া বা ইনসুলিন নেওয়া, সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি উদাসীনতা দেখা দেয়। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং জটিলতার আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের অবসাদে ভোগার ঝুঁকি ২-৩ গুণ বেশি থাকে। কিন্তু এই রোগীদের মধ্যে মাত্র ২৫-৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে সমস্যা সঠিকভাবে শনাক্ত হয় এবং তাঁরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।
অথচ সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা যেমনÑকাউন্সেলিং, ওষুধ কিংবা উভয় পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে, অবসাদ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে এই সমস্যা ধীরে ধীরে আরও জটিল আকার ধারণ করে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। বিষণ্ণতা বা অবসাদের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- সব সময় মন খারাপ থাকা বা এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করা।
- ঘন ঘন মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও হজমে সমস্যা।
- যেকোনো কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
- স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষুধা পাওয়া কিংবা একেবারেই খেতে ইচ্ছে না করা।
- ঠিকমতো ঘুম না হওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঘুমানো।
- যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা।
- অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা।
- ভবিষ্যৎ নিয়ে অকারণেই হতাশা, উৎকণ্ঠা বা অপরাধবোধ কাজ করা।
- আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসা।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ : জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই আমরা কমবেশি মানসিক চাপের সম্মুখীন হই। ভয়, রাগ, হতাশা কিংবা কান্না -এসব আবেগের মধ্য দিয়ে মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কখনো কখনো অতিরিক্ত মানসিক চাপের প্রভাব শরীরেও পড়তে শুরু করে।

দেখা দিতে পারে নানা রকম শারীরিক উপসর্গ যেমন- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, হঠাৎ হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা ইত্যাদি। মানসিক চাপের প্রভাব রক্তে শর্করার মাত্রার ওপরও পড়ে। স্ট্রেস হরমোন, যেমন- কর্টিসল, শরীরে নিঃসৃত হলে তা হঠাৎ করেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে বা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ কেবল ডায়াবেটিস নয়, শরীরের অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। অপরদিকে, উদ্বেগ হলো মানসিক চাপেরই এক দীর্ঘস্থায়ী রূপ, যেখানে মনে অকারণ ভয়, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগের হার সুস্থ মানুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে ডায়াবেটিসের মতো একটি রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা রোগীর কাছে একধরনের মানসিক চাপে পরিণত হয়। যা থেকে দেখা দেয় ক্লান্তি ও উদ্বেগ।
ডায়াবেটিসজনিত হতাশা বা মানসিক অস্বস্তি : অনেক সময় দেখা যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার পরেও রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে না। বরং দেখা দেয় ডায়াবেটিসজনিত নানা শারীরিক জটিলতা। এতে মনে কষ্ট ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং মনে হয়, এত চেষ্টা করেও সবকিছু বৃথা হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অস্বস্তি, ক্লান্তি ও অসহায়ত্ব ধীরে ধীরে গভীর হতাশায় রূপ নেয়। এর প্রভাবে অনেকেই নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন। নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা, ওষুধ খাওয়া কিংবা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো অভ্যাসগুলো অনিয়মিত হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন রোগীই ডায়াবেটিসজনিত হতাশায় ভোগেন।
ডায়াবেটিসের রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়
- সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন। পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।
- প্রতিদিন কিছু সময় ধ্যান বা মেডিটেশন, ব্যায়াম কিংবা যোগব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এটি মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখে।

- যেকোনো নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এড়িয়ে চলুন।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুম নিশ্চিত করুন।
- একা একা থাকলে মানসিক সমস্যা বাড়তে পারে। তাই পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান।
- বই পড়া, গান শোনা, বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করা কিংবা নিজের পছন্দের যেকোনো কাজ করতে পারেন। এতে একঘেয়েমি কেটে যাবে, মনে প্রশান্তি আসবে।
- বিষণ্ণতা, উদ্বেগ বা হতাশা অনুভব করলে তা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখবেন না। কাছের মানুষদের কাছে আপনার সমস্যার কথা খুলে বলুন।
- প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কাউন্সেলিং, থেরাপি বা প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন।

ডা. সাইফুন নাহার
এমবিবিএস, এফসিপিএস (সাইকিয়াট্রি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, এডিকশন সাইকিয়াট্রি ডিপার্টমেন্ট
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শ্যামলী, ঢাকা
ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন
মানসিক রোগ, মাথাব্যথা, মাদকাসক্তি, খিঁচুনিরোগ, যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সাইকোথেরাপিস্ট
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।