ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোর

ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোর : শিশু-কিশোরদের মধ্যে টাইপ-১ ডায়াবেটিস এবং অভিভাবকদের করণীয়

ডায়াবেটিস হতে পারে যেকোনো বয়সেই। শিশু-কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, নারী কিংবা পুরুষ-যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। ডায়াবেটিস সাধারণত চার ধরনের হয়ে থাকে- টাইপ-১, টাইপ-২, গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট ধরন। বয়স্কদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বেশি দেখা যায়। শিশু-কিশোর বা তরুণেরাও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারে, তবে তাদের ক্ষেত্রে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের হার বেশি। টাইপ-১ ডায়াবেটিসকে আগে জুভেনাইল ডায়াবেটিসও বলা হতো। এ রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়। এজন্য তাদের চিকিৎসা, খাদ্য, যত্ন অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় বেশি নেওয়া জরুরি, যাতে কোনোভাবেই তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত না হয়। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের উচিত চিন্তিত না হয়ে সচেতনতা, ভালোবাসা ও ধৈর্যসহকারে শিশু-কিশোরদের আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সচেষ্ট হওয়া।

ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোর

টাইপ-১ ডায়াবেটিস কী

টাইপ-১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ, যা দেহে পর্যাপ্ত ইনসুলিনের অভাবে হয়ে থাকে। এটি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন হরমোন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলোকে নষ্ট করে ফেলে। ফলে দেহে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না বা খুবই অল্পমাত্রায় তৈরি হয়। তখন ইনসুলিনের অভাবে গ্লুকোজ কোষে না গিয়ে রক্তে জমতে থাকে। এতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি থেকে বঞ্চিত হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়।

লক্ষণ ও উপসর্গ

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের উপসর্গগুলো খুব দ্রুত প্রকাশ পায়। যেমন-

  • অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া।
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া।
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া।
  • ওজন অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়া।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বল অনুভব করা।
  • দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া।
  • ক্ষত বা ঘা শুকাতে দেরি হওয়া।
  • দৈনন্দিন কাজকর্মে অনীহা।
  • ঘন ঘন সংক্রমণ।

রোগ নিয়ন্ত্রণে না আনলে আরও কিছু জটিলতা যেমন- বমি, পেটে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে, যাকে ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস বলা হয়।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জটিলতা

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে হঠাৎ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। এই অবস্থাটি তাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। ইনসুলিন নেওয়ার পর বাচ্চা পর্যাপ্ত খাবার খেয়েছে কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হোন। স্কুলে বা বাইরে কোথাও গেলে তার সঙ্গে অবশ্যই মিষ্টিজাতীয় কোনো খাবার যেমন- গ্লুকোজ, ফলের জুস বা মিষ্টি বিস্কুট দিয়ে দিন। সম্ভব হলে একটি গ্লুকোমিটারও দিন, যাতে জরুরি প্রয়োজনে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা যায়। পাশাপাশি স্কুলশিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিশুর ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানিয়ে রাখা জরুরি।

এ ছাড়া টাইপ-১ ডায়াবেটিসে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার পাশাপাশি হৃৎপিণ্ড, কিডনি, চোখ, পা প্রভৃতি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এজন্য এসব জটিলতা সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন থাকুন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা এবং অভিভাবকদের করণীয়

এখন পর্যন্ত টাইপ-১ ডায়াবেটিসের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা হলো ইনসুলিন থেরাপি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রায় ইনজেকশনের সাহায্যে ইনসুলিন নিতে হয়। এ জন্য অভিভাবকদের ইনসুলিন ইনজেকশন দেওয়ার প্রক্রিয়া শিখে নিতে হবে এবং সন্তান বড় হলে তাকেও এটি শিখিয়ে দিতে হবে।

ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোর

এর পাশাপাশি প্রতিদিন গ্লুকোমিটারের সাহায্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করুন। মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কমে বা বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ইনসুলিনের মাত্রা সামঞ্জস্য করে নিন।

ইনসুলিন থেরাপির পাশাপাশি শিশুর খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সুস্থতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে পুষ্টিবিদ বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সুষম ও বয়স উপযোগী খাদ্যতালিকা তৈরি করে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুকে কখনোই অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত কিংবা চর্বি ও কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবার দেবেন না। বিশেষ করে ভাজাপোড়া, চিপস, চকলেট, কোমল পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে রাখুন। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে দিন এবং একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খেতে দিন। পানিশূন্যতা রোধে শিশুকে পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাস গড়ে তুলুন। পাশাপাশি, প্রতিদিন কিছু সময় খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করা খুবই জরুরি।

শুধু ঘরে বসে টিভি দেখা, মোবাইল বা কম্পিউটার গেম খেলে সময় না কাটিয়ে বাচ্চাকে যতটা সম্ভব বাইরে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলুন। এতে শরীর যেমন সুস্থ থাকবে, তেমনি ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। মানসিকভাবেও শিশু হবে চাঙা ও সচল।

ডায়াবেটিস ও শিশু-কিশোর

মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই শিশুর ডায়াবেটিস নিশ্চিত হলে ভেঙে পড়বেন না এবং হতাশ হবেন না। এতে শিশু ভীত হয়ে নিজেকে অপরাধী ভাবতে পারে। গুটিয়ে নিতে পারে সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে। তাই শিশুর সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করুন, তার আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করুন এবং সবার সঙ্গে মিশতে উৎসাহ দিন। পরিবারের সব সদস্য সচেতনতা এবং দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে সঠিকভাবে সন্তানের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হোন।


অধ্যাপক ডা. এ কে এম শাহীন আহমেদ

অধ্যাপক ডা. এ কে এম শাহীন আহমেদ

এফসিপিএস (মেডিসিন), এমসিপিএস (মেডিসিন), এমবিবিএস
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ,
বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ
মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক, গুলশান, ঢাকা


LinkedIn
Share
WhatsApp