মিথ ও বাস্তবতা: ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে পরিচিত এবং জটিল রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডায়াবেটিস। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বংশগত ধারা, মানসিক চাপ প্রভৃতি কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়াবেটিস শরীরে নীরবে বিকাশ লাভ করে এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। এজন্য একে নীরব ঘাতকও বলা হয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি এ রোগটি নিয়ে জনমনে প্রচলিত রয়েছে নানা ভুল ধারণা ও কুসংস্কার। কেউ মনে করেন, শুধু মিষ্টি খাওয়ার কারণেই ডায়াবেটিস হয়, আবার কেউ ভাবেন, ইনসুলিন নেওয়া মানেই রোগ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমন অসংখ্য ভুল বিশ্বাসের কারণে অনেকেই সময়মতো রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। ফলে বাড়ে জটিলতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে যত ভুল ধারণা
স্থূলতাই ডায়াবেটিসের মূল কারণ: ডায়াবেটিস সম্পর্কে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, এটি শুধু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার কারণে হয়। যদিও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে স্থূলতা অন্যতম একটি কারণ, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। ডায়াবেটিসের পারিবারিক ইতিহাস, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রমের অভাব প্রভৃতি কারণে স্বাভাবিক বা কম ওজনের ব্যক্তিরাও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার অনেক স্থূল ব্যক্তিও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে ডায়াবেটিসমুক্ত থাকতে পারেন।
ডায়াবেটিস ছোঁয়াচে: একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডায়াবেটিস ধরা পড়লে অনেকেই এটিকে ছোঁয়াচে রোগ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু ডায়াবেটিস মোটেও ছোঁয়াচে নয়। এটি কখনোই হাঁচি-কাশি, একসঙ্গে খাবার খাওয়া কিংবা শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না।
শুধু বয়স্ক ব্যক্তিরাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন: ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের-টাইপ-১ ও টাইপ-২। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ৪০ বছরের পর টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অপরদিকে, টাইপ-১ ডায়াবেটিস বেশি দেখা যায় শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে। এছাড়াও, যেকোনো বয়সের গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। সুতরাং, ডায়াবেটিস শুধু বয়স্কদের নয়, এটি হতে পারে যেকোনো বয়সেই।
মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খেলে ডায়াবেটিস হয়: মিষ্টিজাতীয় খাবারের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খেলে ওজন বৃদ্ধি পায়, যা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আবার, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের খাদ্যতালিকা থেকে চিনি সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে এ ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিস হলে ফল খাওয়া যাবে না: অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিস হলে ফল খাওয়া একেবারেই নিষেধ। কিন্তু এটি ভুল ধারণা। সব ফলে মিষ্টি বা চিনির পরিমাণ এক রকম থাকে না। কিছু ফলে কেক, বিস্কুট ও মিষ্টির চাইতেও কম চিনি থাকে। এ ছাড়া ফলে রয়েছে আঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ডায়াবেটিসের রোগীরা আপেল, নাশপাতি, আভোকেডো, পেঁপে, শসা, পেয়ারা, স্ট্রবেরি, কালোজাম ইত্যাদি ফল পরিমিত পরিমাণে খেলে তা শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
পরিবারে কারও ডায়াবেটিস না থাকলে নিজেরও ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি নেই: পরিবারে কারও ডায়াবেটিস না থাকলেও যাঁরা স্থূলতায় ভোগেন, প্রি-ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে, বয়স ৪০ বছরের বেশি, নারীদের ক্ষেত্রে আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিংবা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম আছে তাঁদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে।
প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে কোনো ভয় নেই: প্রি-ডায়াবেটিস হলো ডায়াবেটিস হওয়ার ঠিক আগের ধাপ। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, কিন্তু তা ডায়াবেটিসের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম। প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। তাই প্রি-ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে অবহেলা না করে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিতে হবে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাসসহ দৈনন্দিন জীবনযাপনে একটু সচেতন হলে ভবিষ্যৎ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডায়াবেটিস জটিল কোনো রোগ নয়: অনেকেই ডায়াবেটিসকে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা মনে করে অবহেলা করে থাকেন এবং এটি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন না। কিন্তু ডায়াবেটিস কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল রোগ, যা সময়মতো নিয়ন্ত্রণে না আনলে হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, স্নায়ুর সমস্যা, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাসসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
শুধু ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণের মাধ্যমেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়: ইনসুলিন বা ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। এগুলো ডায়াবেটিসের সাধারণ চিকিৎসা, তবে একমাত্র চিকিৎসা নয়। কার্যকরভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা-এ সবকিছুই মেনে চলা জরুরি।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে এলে আর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিন্তু পুরোপুরি নিরাময় করা যায় না। তাই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন বজায় রাখার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং অন্যান্য নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা আক্তার
এমবিবিএস, ডিএনএম (ডিইউ), এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি)
ডায়াবেটিস, হরমোন ও নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড এ্যালায়েড সায়েন্সেস চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাস
চেম্বার: ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।