লাইফস্টাইল হিরো, একজন ডায়াবেটিস জয়ীর গল্প

৬২ বছর বয়সী আবু তাহের একজন ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি গ্রামে বসবাস করেন। বাংলাদেশের ডায়াবেটিক রোগীদের যে বৃহৎ অংশ নিজেরা জানেন না তাঁরা ডায়াবেটিসে ভুগছেন—আবু তাহের তাঁদের একজন।

একজন ডায়াবেটিস জয়ীর গল্প

একদিন বাড়িতে রান্নাঘরের নতুন ছাউনির কাজ করতে গিয়ে অসাবধানতাবসত তাঁর পায়ের আঙুল খানিকটা কেটে যায়। দ্রুত শক্ত কাপড়ে আক্রান্ত স্থান বেঁধে রাখায় রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আর হাসপাতালে যাননি এবং চিকিৎসকের পরামর্শও গ্রহণ করেননি। কিন্তু চিকিৎসাবিহীন থাকায় কিছুদিন পর কাটা জায়গাটা ফুলে যায় এবং ব্যথা বাড়তে থাকে। ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে পরিবারের লোকজন তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেন, ক্ষতস্থানে ইনফেকশন তৈরি হয়েছে এবং তা মাংস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আর তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা ১৫ মিলিমোল/লিটার—যা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। চিকিৎসক জানালেন, আবু তাহের দীর্ঘদিন আগে থেকেই ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। তাই তাঁর ক্ষত শুকাতেও দেরি হচ্ছিল।

এ পর্যায়ে আবু তাহেরের টনক নড়ে। তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সুচিকিৎসার উদ্দেশ্যে শহরে এসে একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এ সময় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে কীভাবে ভালো থাকা যায় সে ব্যাপারে আবু তাহেরকে চিকিৎসক বিস্তর পরামর্শ প্রদান করেন।

কাঁচিতে আঙুল কাটার সাধারণ ঘটনায় ভবিষ্যতের বড় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বেঁচে গেলেন আবু তাহের

কর্মজীবনে প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম করেছেন। সুস্বাস্থ্যের অধিকারীও ছিলেন আবু তাহের। মাত্র একজনের উপার্জন দিয়ে ছেলে-মেয়েদের বড় করেছেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করিয়েছেন। কিন্তু অবসর গ্রহণের পর আবু তাহের একেবারেই অলস জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এখন তাঁর ভারী পরিশ্রম দূরে থাক, নিয়মিত হালকা কাজকর্মেরও দরকার পড়ে না। ছেলেমেয়েরা সবাই চাকরিজীবী, মাসে মাসে টাকা পাঠায়, আর তা দিয়ে আবু তাহেরের শুয়ে-বসেই খাওয়া-পরার বন্দোবস্ত হয়ে যাচ্ছে। মাঠে তাঁর কিছু ফসলি জমি রয়েছে, তাও মজুর দিয়ে চাষাবাদ করেন। পরিশ্রম বলতে এখন কিছুই করেন না। বাজার-সদাইও ছোট ছেলের দায়িত্বে। আবু তাহের প্রতিদিন দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এরপর হাত-মুখ ধুয়ে পাড়ার দোকানে গিয়ে কড়া-মিষ্টি স্বাদের চা পান করেন।

আবু তাহের মিষ্টি খেতে খুব পছন্দ করেন। নিত্যদিন ঘরের বাইরে বের হওয়া বলতে এটাই যেন তাঁর একমাত্র কাজের পরিধি ও ক্ষেত্র। নিয়ম করে সকাল-বিকাল চায়ের দোকানে আড্ডা দেন। খাবার গ্রহণের কোনো সময়সূচি মানেন না। প্রায়ই কোনো বেলা খাবার খেতে ভুলে যান, আবার কোনো বেলায় অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। তাছাড়া তেল-মসলা বেশি খাওয়ার অভ্যাস তাঁর পরিবারে। এমন আরাম-আয়েশই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আবু তাহেরের জীবনে। অবসর গ্রহণের পর থেকে দ্রুত তাঁর ওজন বেড়ে গেছে। শরীরে বাসা বেঁধেছে নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস। ঘন ঘন পিপাসা পাওয়া, প্রস্রাবের বেগ ঘন ঘন আসা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া কিংবা ক্লান্তি

একজন ডায়াবেটিস জয়ীর গল্প

অনুভবের মতো লক্ষণ মাঝেমধ্যে দেখা দিলেও আবু তাহের সেগুলোকে গ্রাহ্য করেননি। অবশেষে ক্ষত বা ঘা শুকাতে দেরি হওয়ার মধ্য দিয়ে আবু তাহের জানতে পারেন তিনি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভুগছেন।

আবু তাহেরের ডায়াবেটিস চিকিৎসা

রোগ নির্ণয়ের পর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। আবু তাহের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সাধারণত এ ধরনের ডায়াবেটিসে শুরুতে লক্ষণ প্রকাশ পায় না। নীরবে দেহের অভ্যন্তরে নানা ধরনের জটিলতা বাড়িয়ে তোলে। এতে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। যাঁদের ওজন বেশি, কায়িক পরিশ্রম করেন না এবং পরিবারে ডায়াবেটিসের রোগী আছে—তাঁরা এ রোগে অধিক আক্রান্ত হন। আবু তাহেরের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনকেই দায়ী করেছেন চিকিৎসক। তাই ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাপনপদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসের দিকে অধিক জোর দিয়েছেন।

শুরুতে মেটফরমিন ও সালফোনাইল ইউরিয়া-জাতীয় কিছু ওষুধ সেবন করতে দেওয়া হয়। এতে ডায়াবেটিসের মাত্রা কয়েকদিনের মধ্যে কমেও আসে। ডায়াবেটিসের চিকিৎসা মূলত চলমান একটি প্রক্রিয়া। তাই খাদ্যাভ্যাসেও আমূল পরিবর্তন আনতে হয়েছে আবু তাহেরের। সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি একটি খাদ্যতালিকা প্রস্তুত করে নিয়েছেন। অতিরিক্ত মিষ্টিজাত এবং তেল-চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করে ফাইবার ও কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার যেমন—শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, ডাল এবং ওটস খাওয়া শুরু করেন।

পাড়ার চা দোকানে অযথা বসে না থেকে আবু তাহের বর্তমানে বাড়িতে হালকা পরিশ্রমের বিভিন্ন কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন। তাছাড়া তিনি সকাল-বিকাল ৩০ মিনিট করে নিয়মিত হাঁটাহাঁটিও করেন। এতে তাঁর শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়তে শুরু করে। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবু তাহেরের ডায়াবেটিসের মাত্রা কমে এসেছে। আবু তাহের সময়মতো ঘুমিয়ে পড়েন, সকাল সকাল জেগে উঠে হালকা ব্যায়ামও করেন। ওষুধ এবং খাবার খেতে আগের মতো অনিয়ম করেন না। ফলে ডায়াবেটিস নিয়েও আবু তাহের এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন।

একজন ডায়াবেটিস জয়ীর গল্প

আবু তাহের বুঝতে পেরেছেন স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। তাছাড়া ছোটখাটো স্বাস্থ্যসমস্যা সম্পর্কেও উদাসীনতা বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ঘন ঘন পিপাসা পাওয়া, প্রস্রাবের বেগ ঘন ঘন আসার লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করলে আরো আগেই সুচিকিৎসা নিয়ে ভালো থাকতে পারতেন। আবু তাহের এখন বুঝেছেন—ডায়াবেটিস থাকলে পায়ে সামান্য কাটা বা ফোসকা যে কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই এখন তিনি নিয়ম করে পা ধুয়ে শুকিয়ে রাখেন, জুতা পরে হাঁটেন, কাজকর্ম করতে গেলে সাবধানে কাজ করেন। আর নিয়মিত বিরতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে চিকিৎসকের ফলোআপে থাকেন। রান্নাঘরের ছাউনির কাজ করতে গিয়ে পায়ের আঙুল কাটার সেই ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে পুরো একটা বছর। আবু তাহের এখন একজন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও তাঁকে দেখলে মনে হয় পুরোটাই সুস্থ সবল। আবু তাহের একজন ডায়াবেটিসজয়ী লাইফস্টাইল হিরো।


অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

এমবিবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (মেডিসিন)
এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি-বারডেম)
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
মেডিসিন, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার: ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।


LinkedIn
Share
WhatsApp