হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

আমাদের দেহে শক্তির প্রধান উৎস হলো শর্করা বা গ্লুকোজ। শর্করা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় রক্তে সঞ্চিত থেকে শরীরের প্রতিটি কোষে, এমনকি মস্তিষ্কেও শক্তি সরবরাহ করে। রক্তে এর ঘাটতি দেখা দিলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা সংক্ষেপে ‘হাইপো’ নামক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। শর্করার এই ঘাটতি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা শর্করা-স্বল্পতায় আক্রান্ত হয়েছেন।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

হাইপোগ্লাইসেমিয়া কী

হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলো এমন একটি অবস্থা, যখন রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে যায়। সাধারণত সুস্থ মানুষের শরীরে রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা খালি পেটে ৩.৯-৫.৫ মিলিমোল প্রতি লিটার। কিন্তু হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ক্ষেত্রে এই মাত্রা ৩.৯ এর নিচে চলে আসে। তৎক্ষণাৎ গ্লুকোজ গ্রহণ করা না হলে, মস্তিষ্কে শর্করা কমে গিয়ে রোগী অচেতন হয়ে পড়েন, অনেক সময় খিঁচুনি শুরু হয়। কখনো কখনো ঘুমের মধ্যেও শর্করা কমে যেতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণ

ডায়াবেটিসের রোগীদের বেশ কিছু কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকে। যেমন—

  • সময়মতো ও সঠিক পরিমাণে খাবার না খাওয়া।
  • খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে শর্করাযুক্ত খাবার না রাখা।
  • অতিরিক্ত ইনসুলিন গ্রহণ কিংবা ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন।
  • খালি পেটে অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়াম করা।
  • অতিরিক্ত মদ্যপান।

দীর্ঘমেয়াদি কিছু শারীরিক সমস্যা: যেমন—হরমোনজনিত অসুস্থতা, অগ্ন্যাশয়, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, হৃদরোগ, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির সমস্যা এমনকি অপুষ্টি বা গর্ভকালীন জটিলতার কারণেও রক্তে শর্করা কমে যেতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন রক্তে শর্করা কমে গিয়েছে

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ শুরুর দিকে সবার ক্ষেত্রেই দেখা যায়। যেমন—

  • হাত-পা কাঁপা।
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া।
  • ক্লান্ত ও দুর্বল অনুভব করা।
  • অস্থির লাগা।
  • বুক ধড়ফড় করা।
  • মাথা ঘোরা ও বমি বমি ভাব।
  • অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভূত হওয়া।
  • ঠোঁটের চারদিকে পিন বা সুই ফোটানোর মতো অনুভূতি।
  • কোনো কাজে মনোযোগ দিতে না পারা।
  • অল্পতেই রেগে যাওয়া বা বিরক্ত হওয়া।

সময়মতো চিকিৎসা শুরু না করলে আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন—

  • দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা।
  • কথা জড়িয়ে যাওয়া।
  • অসংলগ্ন আচরণ বা বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া।
  • কাঁপুনি বা খিঁচুনি দিয়ে শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
  • জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

ঘুমের মধ্যে রক্তে শর্করা কমে গেলে রাতে ঘুম ভেঙে যায়, অতিরিক্ত ঘাম হয় এবং মাথাব্যথা ও ক্লান্তি অনুভূত হয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব গ্লুকোমিটারের সাহায্যে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে, তা ৩.৯-এর নিচে নেমে গেছে কি না। যদি তা হয়, তাহলে অবিলম্বে ১০ থেকে ১৫ গ্রাম গ্লুকোজ কিংবা এক গ্লাস পানিতে আড়াই-তিন চামচ চিনি গুলিয়ে পান করতে হবে। এর পরিবর্তে একটা মিষ্টি চকলেট বা ফলের জুসও খাওয়া যেতে পারে। ১৫ মিনিট পর আবার গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করা জরুরি। যদি তখনো মাত্রা ৩.৯-এর কম থাকে, তাহলে পুনরায় চিনিযুক্ত পানীয় পান করতে হবে। এভাবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা যতক্ষণ না ৬ মিলিমোলের ওপরে ওঠে, ততক্ষণ পর্যন্ত বারবার গ্লুকোজ পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনে শর্করাযুক্ত পানীয় পান চালিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু রোগীর যদি খিঁচুনি শুরু হয় এবং অচেতন হয়ে পড়েন, তবে জোর করে কিছু খাওয়ানো যাবে না। এক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিরায় গ্লুকাগন ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হবে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রতিরোধের উপায়

  • বাড়িতে অবশ্যই একটি গ্লুকোমিটার রাখতে হবে এবং নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
  • প্রতিদিন সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে খাবার খেতে হবে। কোনো বেলার খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে সকালের খাবার যেন কোনোভাবেই বাদ না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
  • ইনসুলিন বা ওষুধ নির্ধারিত মাত্রায় গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করবেন না।
  • হঠাৎ অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ভারী ব্যায়াম করবেন না। যেকোনো ধরনের কায়িক পরিশ্রম করার আগে শর্করাযুক্ত কোনো খাবার খেয়ে নিন।
  • বাইরে গেলে সবসময় চিনিজাতীয় কোনো খাবার কিংবা পানীয় যেমন— গ্লুকোজ, ফলের জুস, বিস্কুট, খেজুর বা মিষ্টি চকলেট সঙ্গে রাখুন।
  • ঘুমের মধ্যে হাইপো হওয়া প্রতিরোধে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিস্কুট কিংবা এক পিস পাউরুটির মতো হালকা কোনো শর্করাযুক্ত খাবার খেতে পারেন।
  • মদ্যপান পরিহার করুন।

অধ্যাপক ডা. মোঃ ফিরোজ আমিন

এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি)
এফএসিই (ইউএসএ)
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, হরমোন বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল ও ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
চেম্বার: ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিক), ঢাকা।


LinkedIn
Share
WhatsApp