মেরুদণ্ডের জটিলতায় মাইক্রোসার্জারি : কাটাছেঁড়া ও ভয় ছাড়াই দ্রুত আরোগ্য
মেরুদণ্ড মানুষের শরীরের প্রধান কাঠামো। এটি ওজন বহন করে এবং নড়াচড়া ও চলাফেরার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করা, সঠিক ভঙ্গিতে ভারী বস্তু না তোলা কিংবা বার্ধক্যের কারণে মেরুদণ্ডের নানা জটিলতা এখন ঘরে ঘরে। একসময় মেরুদণ্ডের জটিলতা ও অস্ত্রোপচার মানেই ছিল কাটাছেঁড়া এবং রোগীর মনে পঙ্গুত্বের এক অজানা আতঙ্ক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিকায়নে সেই ভীতি এখন অতীত। বর্তমান বিশ্বের সর্বাধুনিক ও নিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে মাইক্রোসার্জারি মেরুদণ্ডের রোগীদের জন্য আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। এই পদ্ধতিটি যেমন সুরক্ষিত, তেমনি এটি রোগীকে দ্রুততম সময়ে ফিরিয়ে দেয় তার স্বাভাবিক ও সচল জীবন।

মাইক্রোসার্জারি কী
মাইক্রোসার্জারি মূলত একটি ছোট আকারে কেটে বা মিনিমালি ইনভেসিভ বা অতি ক্ষুদ্র ছিদ্রপথের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। এখানে প্রথাগত অস্ত্রোপচারের মতো বড় আকারে কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। এই পদ্ধতিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে শরীরের অভ্যন্তরীণ স্নায়ু, রক্তনালি এবং ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুগুলোকে কয়েক গুণ বড় এবং অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে দেখে নেওয়া যায়। এই সূক্ষ্ম ভিশনের মাধ্যমে সুস্থ কোনো কোষ বা স্নায়ুর ক্ষতি না করে কেবল সমস্যার মূল অংশটুকু অপসারণ করা হয়। তাই এটিকে বলা হয় অত্যন্ত নিখুঁত সার্জারি। তা ছাড়া, নিউরো-মনিটরিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের প্রতিটি মুহূর্তে স্নায়ুর সংকেত পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা অস্ত্রোপচারের সফলতাকে নিশ্চিত করে তোলে।
মেরুদণ্ডের জটিলতা ও ব্যথার উৎস
অনেকগুলো ছোট ছোট হাড় বা কশেরুকা দিয়ে আমাদের মেরুদণ্ড গঠিত। এই হাড়গুলোর মাঝখানে জেলির মতো একধরনের নরম অংশ থাকে, যাকে বলা হয় ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক। এটি মূলত মেরুদণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা বা শক-অ্যাবজরবার হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কোনো কারণে এই ডিস্কটি ফেটে গেলে বা সরে গিয়ে পাশের সংবেদনশীল স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে শুরু হয় অসহ্য যন্ত্রণা। এ অবস্থাকে বলা হয় পিএলআইডি বা প্রলাপসড লাম্বার ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক। ব্যথা যখন কোমর থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে সায়াটিকা বলা হয়। এই স্তরে এসে যেসব রোগীর সাধারণ ওষুধ বা থেরাপিতে সমস্যার উপশম হয় না। তখন অস্ত্রোপচার অনিবার্য হয়ে পড়ে। পিএলআইডি ও সায়াটিকা ছাড়াও আরো কিছু কারণে মেরুদণ্ডের জটিলতা তৈরি এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। মেরুদণ্ডে জন্মগত কিংবা পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া কোনো বক্রতা (স্কোলিওসিস), হাড়ের ইনফেকশন, টিউমার এবং অস্টিওপোরোসিসজনিত কারণে মেরুদণ্ডের হাড়ে সূক্ষ্ম ফাটল ধরলে মাইক্রোসার্জারি বা এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো বড় কাটাছেঁড়া ছাড়াই নিখুঁত চিকিৎসা প্রদান করা যায়। এই আধুনিক প্রযুক্তি সমস্যার সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন অক্ষুণ্ন রেখে রোগীকে দ্রুত কর্মক্ষম করে তোলে।

অপারেশন-পরবর্তী দ্রুত আরোগ্য
মাইক্রোসার্জারির সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের পর রোগী অবিশ্বাস্য গতিতে সুস্থ হয়ে ওঠে। বড় কোনো ক্ষত না থাকায় অপারেশনের পর ইনফেকশনের ঝুঁকি প্রায় থাকেই না। প্রথাগত অস্ত্রোপচার পদ্ধতিতে রোগীকে যেখানে কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতো, সেখানে মাইক্রোসার্জারির পর রোগী মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই বিছানায় উঠে বসতে পারেন। অধিকাংশ রোগী অপারেশনের পরের দিনই হাসপাতাল থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়িও ফিরতে পারেন। আর্লি মোবিলাইজেশন বা দ্রুত সচল হতে পারা রোগীর মানসিক প্রশান্তি ও শারীরিক আরোগ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ পদ্ধতিতে বড় কোনো ক্ষত না থাকায় ইনফেকশনের ঝুঁকি যেমন কমে যায়, তেমনি ব্যথানাশক ওষুধের প্রয়োজনীয়তাও অনেক কম থাকে।

অধ্যাপক ডা. বি করিম
এমবিবিএস (ঢাকা), এমএস (নিউরো সার্জারি-বিএমইউ)
ব্রেন, স্পাইন, স্পাইনাল কর্ড, হেড ইনজুরি, স্ট্রোক,
মাইক্রোসার্জারি ও এন্ডোস্কোপিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালট্যান্ট
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।