চিকুনগুনিয়া কি

চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ: প্রতিকারে করণীয়

রাহিমা সুলতানা একজন গৃহিণী, বয়স ৪৫ বছর। সারাদিনের কাজ শেষে বিকেলে ছাদবাগানের পরিচর্যা করেন। গত তিনদিন যাবৎ জ্বরে ভুগছেন। একইসঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা ও হাড়ের জোড়ায় ব্যথা। প্রথমে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা থেকে জ্বর এসেছে ভেবে গুরুত্ব দেননি। সাধারণ রক্ত পরীক্ষা করেও জ্বরের কারণ জানতে পারেননি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। রক্তে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি নির্ণয় ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা যায় তিনি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকুনগুনিয়া কি

ভাইরাসজনিত জ্বর চিকুনগুনিয়া। স্ত্রী এডিস ইজিপশাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। চিকুনগুনিয়া প্রাণঘাতী নয়। তবে যথেষ্ট ভোগান্তির কারণ হতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক একই। দুটি জ্বরের উপসর্গগত মিলও রয়েছে। তবে ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া ও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি এমনকি মৃত্যুঝুঁকি থাকলেও চিকুনগুনিয়ায় এ ধরনের ঝুঁকি কম। সাধারণ রক্ত পরীক্ষা বা সিবিসিতে চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে না। রক্তে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি নির্ণয় করে চিকুনগুনিয়া শনাক্ত করা যেতে পারে।

চিকুনগুনিয়া কি

বর্ষার পর যখন মশার উপদ্রব বেশি থাকে
তখন চিকুনগুনিয়ার বিস্তার বেশি দেখা যায়।

চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ

চিকুনগুনিয়ায় সাধারণত দুই থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত জ্বর, তীব্র শরীরব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ থাকে। এরপর নিজে নিজেই সেরে যায়। জ্বর কমে যাওয়ার পরেও ব্যথা থাকতে পারে। তবে, বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যথা সেরে যায়। এর উপসর্গগুলো অনেকটা ডেঙ্গুজ্বরের মতো। তবে চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে দেহের তাপমাত্রা বেশি থাকে। যা প্রায়ই ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠানামা করে।

চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ
  • হঠাৎ তীব্র জ্বর আসা
  • মাংসপেশিতে ব্যথা
  • অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
  • হাত-পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা
  • কবজিতে ব্যথা
  • চোখ জ্বালাপোড়া
  • সর্দিকাশি
  • মাথাব্যথা
  • বমিভাব বা বমি
  • চামড়ায় লালচে দানা বা র্্যাশ
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা

চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক। এর কোনো বিশেষ ওষুধ বা টিকা নেই। টানা তিনদিনের বেশি জ্বর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। পরামর্শমতো প্যারাসিটামল ও ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা যাবে না। সাধারণত ভাইরাসজনিত জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। বরং অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরবর্তীকালে জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ সময় শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যায়। তাই সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকা প্রয়োজন। প্রচুর পরিমাণে পানি পান ও তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত ইত্যাদি গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ

সচেতনতাই চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। প্রাথমিকভাবে এই রোগ চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত স্ত্রী এডিস ইজিপশাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে বিস্তার ঘটায়। এরা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত থেকে জীবাণু নিয়ে অন্যদেরকেও আক্রান্ত করে।
এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত শরীরে গ্রহণ করলে বা ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার সময় অসাবধানতাবশত এটি ছড়াতে পারে। সাধারণত এই মশা দিনের আলোতে কামড়ায়। তাই দিনে ঘুমালে মশারি ব্যবহার করা ও ফুলহাতা জামা পরিধান করা যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যেন মশা না কামড়াতে পারে সেদিকে বিশেষ লক্ষ রাখা প্রয়োজন। এছাড়াও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে যেসব বিষয় মেনে চলা জরুরি—

  • ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
  • বাড়িতে বাগান করলে সবসময় তা পরিষ্কার রাখুন।
  • বাইরে গেলে মশা প্রতিরোধক ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।
  • ঘরের জানলায় মশানিরোধক নেট লাগিয়ে নিতে পারেন।
  • যেকোন সময় ঘুমালে মশারি বা মশানিরোধক স্প্রে ব্যবহার করুন।
  • ঘরে, বারান্দায় বা বাড়ির আশপাশে পানি জমিয়ে রাখবেন না।
  • যেসব স্থানে মশা প্রজনন করতে পারে সেসব স্থান ধ্বংস করুন।
  • শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিন।
  • উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অধ্যাপক ডা. শংকর নারায়ণ দাস

অধ্যাপক ডা. শংকর নারায়ণ দাস

এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমডি
এফআরসিপি (গ্লাসগো, ইউকে)
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ ও অধ্যক্ষ (অব.)
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ
সিনিয়র কনসালট্যান্ট
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share
WhatsApp