পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি : হাত-পা ঝিনঝিন করা বা অবশ হওয়া
পঞ্চাশোর্ধ্ব গৃহিণী সালমা বেগম বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করছেন, রাতে ঘুমানোর সময় তাঁর হাতের তালুতে যেন কেউ পিন ফোটাচ্ছে। মাঝে মাঝে পায়ের পাতা এতটাই অবশ হয়ে যায় যে, হাঁটার সময় মনে হয় যেন তুলার ওপর দিয়ে হাঁটছেন। প্রথমে সাধারণ কোনো সমস্যা ভেবে এড়িয়ে গেলেও আতঙ্কিতবোধ করলেন সেদিন, যেদিন তরকারি কাটার সময় আঙুল কেটে গেলেও তিনি কোনো ব্যথা অনুভব করলেন না। চিকিৎসকের কাছে গেলে জানতে পারলেন, তিনি ‘পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি’ নামক সমস্যায় ভুগছেন। তবে চিকিৎসক তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে, সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে স্নায়ুর এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং পুনরায় সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।

পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি কী
আমাদের স্নায়ুতন্ত্র মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং পেরিফেরাল বা প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্ক এবং মেরুরজ্জু নিয়ে গঠিত। অপরদিকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে উৎপন্ন হয়ে শরীরের হাত-পা, আঙুল এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিস্তৃত স্নায়ুগুচ্ছই হলো পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্র। এই পেরিফেরাল স্নায়ুগুলোই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সংযোগ রক্ষা করে। কোনো রোগ বা আকস্মিক আঘাতের কারণে এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। এর ফলে হাত ও পায়ে নানা ধরনের অস্বাভাবিক অনুভূতি তৈরি হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি’ নামে পরিচিত।
কেন হয় এই রোগ
নানাবিধ কারণে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হতে পারে। যেমন—
ডায়াবেটিস : নিউরোপ্যাথির অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে স্নায়ুর মারাত্মক ক্ষতি হয়। ফলে হাত-পা ঝিনঝিন করা বা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
অটোইমিউন রোগসমূহ : লুপাস, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, গুইলেন-বারে সিনড্রোম, ভাস্কুলাইটিস প্রভৃতির মতো অটোইমিউন রোগসমূহ পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির অন্যতম কারণ।
ভিটামিনের অভাব : শরীরে কিছু ভিটামিন বিশেষ করে ভিটামিন বি-১, বি-৬, বি-৯, বি-১২ এবং ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি থাকলে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংক্রমণ : নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ স্নায়ুতন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— লাইম ডিজিজ, হার্পিস জোস্টার, হেপাটাইটিস বি ও সি, কুষ্ঠ বা লেপ্রোসি, ডিফথেরিয়া এবং এইচআইভি।

দীর্ঘমেয়াদি রোগ : কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা, ক্যানসার এবং থাইরয়েডের সমস্যার কারণেও পেরিফেরাল স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আঘাতজনিত কারণ : কোনো দুর্ঘটনায় সরাসরি স্নায়ুতে আঘাত লাগলে বা হাড়ের কোনো সমস্যা থেকে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হতে পারে।
এছাড়া বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও স্নায়ুর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথির লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণ কিছু উপসর্গ হলো:
- হাত-পা ঝিনঝিন করা বা সুই ফোটানোর মতো অস্বস্তি অনুভূত হওয়া।
- আক্রান্ত স্থানে জ্বালাপোড়া কিংবা তীব্র ব্যথা হওয়া।
- পেশিশক্তি কমে যাওয়া, যার ফলে হাঁটাচলা করতে বা কোনো কিছু ধরতে সমস্যা হওয়া।
- গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি ঠিকমতো বুঝতে না পারা।
- শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হওয়া এবং বারবার পড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেওয়া।
- অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থান পুরোপুরি অবশ বা অসাড় হয়ে যায়, যার ফলে রোগী কোনো আঘাত পেলে বা
- কেটে গেলেও তা বুঝতে পারেন না। এতে পরে ক্ষতস্থানে মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে
যদি দেখা যায় যে হাত-পা ঝিনঝিন করার মাত্রা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, পায়ের পাতা বা আঙুলের অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে, রাতে ব্যথার কারণে ঘুম হচ্ছে না এবং হাত-পায়ের পেশি দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে তাহলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
সাধারণত রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন—রক্ত পরীক্ষা, ইলেকট্রোমায়োগ্রাফি (ইএমজি), সিটি স্ক্যান বা এমআরআই এবং নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডির (এনসিএস) মাধ্যমে স্নায়ুর ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসাপদ্ধতি মূলত নির্ভর করে রোগের মূল কারণের ওপর। যদি ডায়াবেটিসের কারণে এমন হয়, তবে প্রথমেই শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। ভিটামিনের অভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যথার তীব্রতা কমাতে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ যেমন— নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস, গ্যাবাপেন্টিন, প্রেগাবালিন প্রভৃতি কার্যকর। এ ছাড়া স্নায়ুকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং পেশিশক্তি ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেনে চলুন কিছু নিয়ম-কানুন
পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি:

- নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে এবং স্নায়ু সচল রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার বিশেষ করে— সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, দুধ, ডিম রাখুন।
- ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করুন।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম নিশ্চিত করুন।
- স্নায়ুর ক্ষতি করতে পারে এমন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যেমন: কীটনাশক, সিসা বা পারদ প্রভৃতির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন।

অধ্যাপক ডা. মোঃ আশরাফ আলী
এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন)
এমডি (নিউরোলজি), এফআরসিপি (এডিন)
মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নিউরোলজি বিভাগ
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।