স্ট্রোকের গোল্ডেন আওয়ারে চিকিৎসা শুরু হলে প্রাণ বাঁচে, পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কমে
আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষই স্ট্রোককে হার্ট অ্যাটাক মনে করে রোগীকে দ্রুত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। শুরুতেই রোগ শনাক্তে এমন ভুলের কারণে চিকিৎসার অমূল্য সময়টুকু নষ্ট হয়। অথচ স্ট্রোক হলো মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালনে বাধা বা রক্তক্ষরণজনিত সেই জটিল স্নায়বিক অবস্থা, যার চিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। হৃদযন্ত্রের রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে চিকিৎসার জন্য যেটুকু সময় পাওয়া যায়, মস্তিষ্কের কোষগুলো সেই তুলনায় অনেক কম সময় বেঁচে থাকতে পারে। তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ামাত্রই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, দীর্ঘস্থায়ী পঙ্গুত্বের পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।

গোল্ডেন আওয়ার কী
স্ট্রোক হওয়ার পর নির্দিষ্ট একটি সময়সীমার মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়টিকেই বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। স্ট্রোক-পরবর্তী সাড়ে চার ঘণ্টাকে এই মহামূল্যবান সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ধমনির রক্তপ্রবাহ পুনরায় স্বাভাবিক করা গেলে, রোগী খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু চিকিৎসায় সামান্য দেরি হলেই পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। এ জন্যই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে বলা হয়—‘টাইম ইজ ব্রেন’। কারণ স্ট্রোকের পর প্রতি মিনিটে মস্তিষ্কের প্রায় ১৯ লাখ কোষ নষ্ট হয়ে যায়। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই কোষগুলো আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই চিকিৎসায় দেরি মানেই আজীবনের জন্য প্যারালাইসিস বা পঙ্গুত্বের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। এ জন্য স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি।
এফএএসটি : স্ট্রোকের লক্ষণ চেনার সহজ উপায়
স্ট্রোক হয়েছে কি না, তা দ্রুত শনাক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সহজ পদ্ধতি হলো ‘এফএএসটি’। এই পদ্ধতিতে যে কেউ খুব সহজেই রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
এফ (ফেস বা মুখ) : রোগী হাসতে গেলে মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া বা ঝুলে পড়া।
এ (আর্ম বা হাত) : দুই হাত একসঙ্গে ওপরে তুলতে কষ্ট হওয়া কিংবা একটি হাত দুর্বল হয়ে নিচে নেমে আসা।
এস (স্পিচ বা কথা) : কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট কথা কিংবা কথা বলতে গিয়ে শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
টি (টাইম বা সময়) : ওপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
‘এফএএসটি’-তে উল্লেখ করা লক্ষণগুলো ছাড়াও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন—
- হঠাৎ শরীরের এক পাশ বা কোনো অঙ্গ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
- দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা।
- তীব্র মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা শুরু হওয়া।
- বিভ্রান্তি বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
- শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়া।

গোল্ডেন আওয়ারে রোগীর জীবন বাঁচাতে করণীয়
স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের হয়—ইসকেমিক এবং হেমোরেজিক। ইসকেমিক স্ট্রোকে রক্তে থাকা চর্বি ও কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ কণা হঠাৎ করে মস্তিষ্কের কোনো ধমনিতে আটকে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে কোষ পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে নিস্তেজ হতে হতে অকেজো হয়ে যায়। অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের দুর্বল রক্তনালি ছিঁড়ে যায় বা ফেটে যায়। এতে মস্তিষ্কে রক্তপাত হয়, রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। এ ছাড়া ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক স্ট্রোক বা ওয়ার্নিং স্ট্রোক নামে আরো একধরনের স্ট্রোক আছে। এ ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের জন্য রোগী স্ট্রোকের মতো উপসর্গে ভুগে থাকেন, যা মিনি স্ট্রোক নামে পরিচিত।
‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা প্রথম সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া হলে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। ইসকেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তনালিতে জমে থাকা রক্তপিণ্ডটি গলিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। একে ‘থ্রম্বোলাইসিস’ বলে। ওষুধের মাধ্যমে রক্তনালির বাধা দূর করা সম্ভব না হলে ‘মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি’ নামক সর্বাধুনিক পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে পায়ের বা ঘাড়ের রক্তনালি দিয়ে একটি সরু ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে যান্ত্রিক ডিভাইসের সাহায্যে মস্তিষ্কের জমাট বাঁধা রক্ত বের করে আনা হয়। এই পদ্ধতিতে রোগীর দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
অপরদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রধান লক্ষ্য হলো রক্তপাত দ্রুত বন্ধ করা এবং অস্বাভাবিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা। জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা দ্রুত অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া খিঁচুনি বা অন্য কোনো জটিলতা রোধ করতে রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
‘মিনি স্ট্রোক’ বা টিআইএ-এর মতো সাময়িক লক্ষণগুলোকেও অবহেলা না করে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রতিরোধ করুন সহজেই
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ৯০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ কারণগুলো হলো—
- উচ্চ রক্তচাপ।
- ডায়াবেটিস ও স্থূলতা।
- রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল।
- ধূমপান ও মদ্যপান।
- হৃদরোগ।
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
- মানসিক অবসাদ।
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।

এ ছাড়া কিছু ঝুঁকির কারণ রয়েছে, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেমন—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। সাধারণভাবে পুরুষদের মধ্যে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। স্ট্রোকের পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া রক্তনালির কিছু জন্মগত বা গঠনগত সমস্যা থাকলেও স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকে। তাই স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাই স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

অধ্যাপক ডা. মোঃ শহীদুল্লাহ (সবুজ)
এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন)
এমডি (নিউরোলজি)
ফেলো ইন ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি অ্যান্ড স্ট্রোক (নিউ দিল্লি)
নিউরোলজিস্ট
প্রাক্তন অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।
