ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে নিন

ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে নিন

মস্তিষ্ক আমাদের দেহের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। চিন্তা, বুদ্ধি, স্মৃতি এবং শরীরের চলাচলের প্রতিটি সংকেত এই মস্তিষ্ক থেকেই আসে। কিন্তু যখন এই সংকেত প্রদানকারী অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গের ভেতরে টিউমারের জন্ম হয়, তখন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ সময় শরীরে কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষণও প্রকাশ পায়। তবে অধিকাংশ মানুষ এগুলোকে সাধারণ মাথাব্যথা কিংবা শারীরিক দুর্বলতা ভেবে মূলত টিউমারের লক্ষণগুলোকেই অবহেলা করেন। যার ফলে রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে। তবে, প্রাথমিক অবস্থায় লক্ষণগুলো চিনে চিকিৎসা শুরু করলে ব্রেন টিউমার জয় করা যায়।

ব্রেন টিউমার কী

মস্তিষ্কের কোনো অংশে যখন কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হয়ে একটি পিণ্ড তৈরি করে, তখন তাকে ব্রেন টিউমার বলে। টিউমারটি যখন বড় হতে থাকে, তখন এটি মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। যার ফলে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। ব্রেন টিউমার মানেই ক্যানসার নয়। এটি বিনাইন বা ক্যানসারবিহীন টিউমার হতে পারে। আবার ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারযুক্ত টিউমারও হতে পারে। তবে টিউমার যে ধরনেরই হোক, মস্তিষ্কের সীমিত জায়গায় এর উপস্থিতি স্নায়বিক জটিলতা তৈরি করে। টেনটোরিয়াম নামক একটি পর্দা দিয়ে আমাদের ব্রেন বা মস্তিষ্ক দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত থাকে। এই পর্দার ওপর এবং নিচের যেকোনো পাশেই টিউমার হতে পারে। মানবশরীরে কিছু জিন আছে, যা টিউমার হওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রতিরোধ করে। এদের বলে টিউমার সাপ্রেসর জিন। কোনো কারণে টিউমার সাপ্রেসর জিন যদি যথাযথ কাজ করতে না পারে, তখন ব্রেন টিউমার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ব্রেন টিউমারের ধরন

টিউমারগুলো মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে।

বিনাইন বা ক্যানসারবিহীন টিউমার : এই টিউমারগুলো খুব ধীরে বাড়ে এবং এগুলো শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়ে না। সঠিক চিকিৎসায় এগুলো পুরোপুরি সেরে যায়।

ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসারযুক্ত টিউমার : এগুলো খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মস্তিষ্কের সুস্থ টিস্যুগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। এটি আবার দুই প্রকার—প্রাইমারি এবং মেটাস্টেটিক। প্রাইমারি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার মস্তিষ্কেই উৎপন্ন হয়। মেটাস্টেটিক শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ যেমন—ফুসফুস কিংবা স্তনের ক্যানসার থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে।

লক্ষণ ও উপসর্গ

টিউমার মস্তিষ্কের কোন অংশে অবস্থিত, তার ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো :

  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথায় প্রচণ্ড চাপ ও ব্যথা অনুভব করা।
  • আকস্মিকভাবে বমি হয় এবং প্রায়ই বমি বমি ভাব হয়।
  • আক্রান্ত ব্যক্তির দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। একটি জিনিসকে দুটি দেখেন। প্রায়ই পার্শ্বদৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন।
  • হাত ও পায়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হয়।
  • চলাফেরায় ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা হয়।
  • হঠাৎ করে কথা বলতে অসুবিধা কিংবা কথা জড়িয়ে যায়।
  • দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্তি বা অবসন্নতা অনুভব করেন।
  • প্রয়োজনীয় বিষয় মনে রাখতে না পারা।
  • অস্বাভাবিক হারে মেজাজ হারানোর লক্ষণ দেখা দেয়।
  • ইতিপূর্বে খিঁচুনির কোনো ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ খিঁচুনি দেখা দেয়।
  • কানে কম শোনা এবং মাথা ঘোরানোর সমস্যা হয়।
  • অস্বাভাবিক হারে ক্ষুধার মাত্রা বেড়ে যায় এবং দ্রুত শারীরিক ওজন বেড়ে যায়।

ব্রেন টিউমার নির্ণয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা

মাথার সিটি স্ক্যান : দীর্ঘমেয়াদি মাথাব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গের কারণ খুঁজতে প্রথম ধাপ হিসেবে সিটি স্ক্যান করা হয়। এটি মস্তিষ্কের ভেতরের জটিলতা এবং কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

ব্রেন এমআরআই এবং ফাংশনাল এমআরআই : ব্রেন টিউমার শনাক্তকরণের জন্য এমআরআই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, কারণ এটি সিটি স্ক্যানের চেয়ে অনেক পরিষ্কার ছবি প্রদান করে। ফাংশনাল এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোন অংশটি কথা বলা, নড়াচড়া বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি জানা যায়। এটি সার্জারির পরিকল্পনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স স্পেকট্রোস্কোপি : এর মাধ্যমে টিউমার কোষের ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদানগুলোর মাত্রা পরিমাপ করা হয়। যা টিউমারের ধরন বুঝতে সহায়ক হতে পারে।
ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স পারফিউশন : এটি টিউমারের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহের পরিমাণ নির্ণয় করে। টিউমারের যে অংশ বেশি সক্রিয়, সেখানে রক্তপ্রবাহ বেশি থাকে।

বায়োপসি বা টিস্যু সংগ্রহ : এ পদ্ধতিতে টিউমার থেকে এক টুকরো টিস্যু বা নমুনা সংগ্রহ করে সেটি ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করে দেখা হয় কোষগুলো ক্যানসারযুক্ত কি না। এ ছাড়া কোষের বৃদ্ধির গতি দেখে টিউমারের গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে কোষের ডিএনএ পরিবর্তনগুলোও পরীক্ষা করা হয়।

ব্রেন টিউমারের আধুনিক চিকিৎসা

ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা মূলত টিউমারের ধরন, অবস্থান এবং আকারের ওপর নির্ভর করে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর প্রতিকারের জন্য বেশ কিছু কার্যকর পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। যেমন—

সার্জারি বা অস্ত্রোপচার : ব্রেন টিউমার চিকিৎসার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো সম্ভব হলে সবটুকু টিউমার কোষ অপসারণ করা। তবে সব সময় তা পুরোপুরি সম্ভব হয় না। রোগীর নিরাপত্তা বজায় রেখে যতটুকু সম্ভব টিউমার সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এটি ক্যানসারযুক্ত এবং ক্যানসারবিহীন—উভয় ধরনের টিউমারের জন্যই কার্যকর পদ্ধতি।

ক্রানিওটমি : এটি সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। এতে মাথার খুলির একটি অংশ সাময়িকভাবে অপসারণ করে মস্তিষ্কে পৌঁছানো হয় এবং বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে টিউমারটি কেটে বের করে আনা হয়। এরপর মাথার খুলির হাড়টি পুনরায় যথাস্থানে বসিয়ে দেওয়া হয়।

এন্ডোস্কোপিক সার্জারি : এ পদ্ধতিতে নাকের ছিদ্র দিয়ে একটি সরু টিউব বা নল প্রবেশ করিয়ে পিটুইটারি অংশের টিউমার অপসারণ করা হয়।

প্রোটন থেরাপি : এটি রেডিয়েশনের একটি আধুনিক রূপ। এতে প্রোটন রশ্মি ব্যবহার করা হয় যা সুস্থ কোষের ক্ষতি না করে সরাসরি টিউমারকে লক্ষ্য করতে পারে। এটি শিশুদের চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

রেডিওসার্জারি : এটি নামে সার্জারি হলেও এতে কোনো অস্ত্রোপচার বা কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। এটি মূলত রেডিয়েশন থেরাপির একটি নিবিড় রূপ। এতে বিভিন্ন দিক থেকে অনেকগুলো সূক্ষ্ম রশ্মি টিউমারের ওপর ফেলা হয়। যেখানে সব রশ্মি মিলিত হয়, সেখানে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন তৈরি হয়ে টিউমার কোষ ধ্বংস করে।

কেমোথেরাপি : শক্তিশালী ওষুধের মাধ্যমে টিউমার কোষ ধ্বংস করার পদ্ধতিই হলো কেমোথেরাপি। এই ওষুধগুলো মুখে খাওয়া যায় আবার ইনজেকশনের মাধ্যমে শিরায় প্রবেশ করানো যায়। অনেক সময় অস্ত্রোপচারের পর সরাসরি ব্রেন টিস্যুতেও এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

টার্গেটেড থেরাপি : এই পদ্ধতিতে এমন সব ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা টিউমার কোষের ভেতরে থাকা সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক উপাদানগুলোকে আক্রমণ করে। এই রাসায়নিকগুলো বাধাগ্রস্ত হলে টিউমার কোষগুলো মারা যায়।


অধ্যাপক ডা. হারাধন দেব নাথ

অধ্যাপক ডা. হারাধন দেব নাথ

এমবিবিএস, এমএস (নিউরো সার্জারি), এফএসিএস (ইউএসএ)
ব্রেন টিউমার, স্পাইন সার্জারি, শিশু নিউরো সার্জারিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত,
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইন্স, নিউদিল্লি, ইন্ডিয়া।
অধ্যাপক, নিউরো সার্জারি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল

LinkedIn
Share
WhatsApp