পক্ষাঘাত : ফিজিওথেরাপি ও সুস্থ জীবনে ফেরা

পক্ষাঘাত : ফিজিওথেরাপি ও সুস্থ জীবনে ফেরা

পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের কোনো অংশের মাংসপেশি তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী কেবল শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। একসময় ধারণা করা হতো পক্ষাঘাত মানেই চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং উন্নত ফিজিওথেরাপি পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক রোগীই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস কী

মস্তিষ্ক থেকে যখন মাংসপেশিতে সংকেত পৌঁছাতে পারে না, তখনই প্যারালাইসিস হয়। এটি সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে। আংশিক প্যারাইলাইসিস বা শরীরের এক পাশ কিংবা কিছু অংশ অবশ হওয়া। পূর্ণাঙ্গ প্যারালাইসিস বা পুরো শরীর অর্থাৎ উভয় পাশের হাত-পা অবশ হওয়া। প্যারালাইসিস নিজে কোনো রোগ নয়, এটি অন্য কোনো শারীরিক জটিলতার ফলাফল।

পক্ষাঘাতের প্রধান কারণসমূহ

স্ট্রোক : মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্ত সরবরাহ বন্ধ হওয়া পক্ষাঘাতের প্রধান কারণ।

মেরুদণ্ডে আঘাত : দুর্ঘটনায় শিরদাঁড়া বা স্পাইনাল কর্ডে আঘাত পেলে নিচের অংশ অবশ হয়ে যেতে পারে।

নিউরোলজিক্যাল ডিজিজ : মাল্টিপল স্কলেরোসিস এবং গুলেন বারি সিনড্রোমের (জিবিএস) কারণে প্যারালাইসিস হতে পারে।

জন্মগত ত্রুটি : সেরিব্রাল পালসির কারণে শিশুদের মধ্যে পক্ষাঘাত দেখা যায়।

ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব

অনেক সময় পক্ষাঘাতের চিকিৎসায় ওষুধের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় ফিজিওথেরাপির। কারণ অকেজো হয়ে পড়া মাংসপেশিকে পুনরায় সক্রিয় করার উপায় হলো সুনির্দিষ্ট ব্যায়াম। দীর্ঘ সময় অবশ থাকলে হাত-পা শক্ত হয়ে যায়, ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে এই জড়তা দূর হতে পারে।

সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমে আক্রান্ত স্থানে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়, যা স্নায়ুর পুনর্গঠনে সাহায্য করে। সঠিক নিয়ম মেনে এসব ব্যায়াম করলে রোগী দ্রুত পুনরায় উঠে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে সক্ষম হয়। ফিজিওথেরাপি সেন্টারে কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির ব্যবহারও করা হয়। ইনফ্রারেড রেডিয়েশন এবং ট্রান্সকিউটেনিয়াস ইলেকট্রিক্যাল নার্ভ স্টিমুলেশন ব্যবহারের মাধ্যমে স্নায়ুকে পুনরায় উদ্দীপ্ত করা হয়।

পুনর্বাসন ও সুস্থ জীবনে ফেরা

পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির সুস্থ হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ সময় ফিজিওথেরাপিস্টের প্রচেষ্টা, রোগীর মনোবল এবং পরিবারের সদস্যদের আন্তরিক সহযোগিতা—চিকিৎসা কার্যক্রমকে দ্রুত সফল করে তোলে। শুধু ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে এসে সেবা নিয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে শুয়ে-বসে থাকলে চলবে না। বাড়িতেও রোগীর এবং পরিবারের সদস্যদের কিছু করণীয় রয়েছে।

ধৈর্য ও মনোবল : প্যারালাইস হলে আক্রান্ত ব্যক্তি মনোবল হারাতে শুরু করেন। তাঁকে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কিছুতে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। যার ফলে অনেকেই নিজেকে নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের উচিত রোগী যেন মানসিকভাবে ভেঙে না পড়েন সেদিক লক্ষ রাখা। রোগীকে মানসিকভাবে সাহস জোগানোর পাশাপাশি বিষণ্নতা কাটানোর জন্য আলাদাভাবে কাউন্সেলিং করানো যেতে পারে।

আকুপ্রেশার ও ব্যায়াম : ফিজিওথেরাপি সেন্টারের সেবা তখন সবচেয়ে কার্যকর হবে, যখন বাড়িতে থাকার বাকি সময়েও থেরাপিস্টের বলে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী ব্যায়াম করবেন। ব্যথা ও অবশ অনুভূতি এবং স্নায়ুজনিত সমস্যায় আকুপ্রেশার খুব উপকারী হতে পারে। আকুপ্রেশার করার পদ্ধতি ফিজিওথেরাপিস্টের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন। ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করলে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত মাংসপেশি দ্রুত পুনর্গঠিত হতে পারে।

সহায়ক উপকরণের ব্যবহার : প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তি চলাচলের প্রয়োজনে হুইলচেয়ার এবং ক্রাচ ব্যবহার করতে পারেন। শুয়ে-বসে থাকলে হতাশা জেঁকে ধরে। নড়াচড়া করতে পারলে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ভালো থাকবেন।

পরিবেশের পরিবর্তন : রোগীর জন্য ঘরে নিচু আসবাবপত্রের ব্যবস্থা এবং রোগীর ব্যবহার উপযোগী টয়লেটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে রোগী অন্যের ওপর কম নির্ভরশীল হবে এবং মানসিকভাবে নিজেকে শক্তিশালী মনে করবে।

পক্ষাঘাত হওয়ার পরপরই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। পরিবারের যে কেউ এতে আক্রান্ত হলে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু করুন। আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত সুচিকিৎসা পেলে রোগীর সুস্থতা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সহজ হয়।


অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোজাফফর আহমেদ

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোজাফফর আহমেদ

এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমআরসিপি (লন্ডন)
পিএইচডি, এমএসিপি (আমেরিকা)
অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা
ফিজিক্যাল মেডিসিন, রিউম্যাটোলজি, বাত ব্যথা ও জয়েন্ট রোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

LinkedIn
Share
WhatsApp