পারকিনসনস : যখন হাত-পা কাঁপে
আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অতি সাধারণ কোনো কাজ যেমন— এক গ্লাস পানি খাওয়া, শার্টের বোতাম লাগানো কিংবা স্বাভাবিকভাবে হাঁটা সবই পরিচালিত হয় মস্তিষ্কের এক সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে। কিন্তু যদি হঠাৎ দেখা যায়, এসব স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটছে; হাত বা পা নিজের অজান্তেই কাঁপছে, শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে কষ্ট হচ্ছে কিংবা শরীর ধীরে ধীরে আড়ষ্ট হয়ে আসছে, তবে তা আর সাধারণ কোনো সমস্যা নয়। এই নীরব শারীরিক সমস্যাটির নাম হলো ‘পারকিনসনস’। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও সঠিক ধারণা না থাকায় অনেকেই একে বয়সজনিত স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে অবহেলা করে থাকেন। অথচ সময়মতো শনাক্তকরণ এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে একজন পারকিনসনসে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও কর্মক্ষম হতে পারে।

পারকিনসনস রোগ কী
পারকিনসনস মূলত স্নায়ুকোষের ক্ষয়জনিত এক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ। আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে ‘সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা’ নামক একটি বিশেষ অংশ রয়েছে। এই অংশ থেকে ‘ডোপামিন’ নামক একধরনের রাসায়নিক পদার্থ বা নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় মস্তিষ্কের ‘ব্যাজাল গ্যাংলিয়া’ নামক অংশটি এই ডোপামিনের সহায়তায় আমাদের চলাফেরা বা শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু কোনো কারণে যখন ডোপামিন তৈরি করা কোষগুলো শুকিয়ে যায় বা নষ্ট হতে শুরু করে, তখন শরীরে ডোপামিনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে শরীরের পেশিগুলোর ওপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং পারকিনসনসের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
কেন হয়
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পারকিনসনস রোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে জিনগত কারণে রোগটি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ, পরিবারের কারো এই রোগ থাকলে অন্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, বারবার মস্তিষ্কে আঘাত, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, উইলসন ডিজিজ—এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে পারকিনসনসের লক্ষণ প্রবল থাকে, যাকে পারকিনসনিজম বলা হয়। ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে জিনগত কারণে হলে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সেও পারকিনসনস হতে পারে।
পারকিনসনসের লক্ষণসমূহ
পারকিনসনসের পূর্বাভাস হিসেবে ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়া, কথা বলা অথবা চিৎকার করার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরে রোগটি বিকশিত হলে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়—
- হাত-পা কাঁপা।
- শরীরের পেশিগুলো অস্বাভাবিক শক্ত হয়ে যাওয়া।
- চলাফেরার গতি ধীর হয়ে যাওয়া।
- যেকোনো কাজ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগা।
- হাতের লেখা ছোট ও অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া।
- শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারায় সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটা এবং বারবার পড়ে যাওয়া।
- কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে যাওয়া।
- চোখের পলক পড়ার হার কমে যাওয়া এবং মুখমণ্ডল অনেকটা ভাবলেশহীন হয়ে পড়া।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ অনুভব করা বা প্রস্রাব আটকে যাওয়া।
- কোষ্ঠকাঠিন্য।
- হতাশা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঘুম কম হওয়া।
পারকিনসনসের পাঁচ পর্যায়

পর্যায় এক : রোগের একদম প্রাথমিক বা মৃদু পর্যায়। এই পর্যায়ে শরীরের এক পাশের হাত-পায়ে কাঁপুনি দেখা দেয়।
পর্যায় দুই : শরীরের দুই পাশের হাত-পায়ে কাঁপুনি দেখা দেয়।
পর্যায় তিন : এই পর্যায়ে রোগীর শরীর ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে চলাফেরা করতে গিয়ে বারবার পড়ে যান।
পর্যায় চার : চতুর্থ পর্যায়ে এসে রোগীর শরীরের বিভিন্ন পেশি শক্ত হয়ে যায়। ফলে নড়াচড়া করতে সমস্যা হয়। রোগী কোনো সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতেও পারেন না।
পর্যায় পাঁচ : এই পর্যায়ে রোগী নিজে কিছুই করতে পারেন না। তখন তাঁকে হুইলচেয়ারে রাখতে হয় অথবা রোগী একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
পারকিনসনস একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ; পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়। ডায়াবেটিস হলে যেমন সারা জীবন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে হয়, তেমনি পারকিনসনস রোগের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। তাই এই রোগের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
মস্তিষ্কে ডোপামিনের অভাবে পারকিনসনস রোগটি হয়, তাই ‘লিভোডোপা’-জাতীয় ওষুধ এই রোগের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এ ছাড়া রোগের পর্যায় ও লক্ষণের ভিন্নতা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা আরও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে পারকিনসনস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ সেবনের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে, পেশির আড়ষ্টতা কমাতে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি কথা বলার জড়তা বা অন্যান্য বাক্সমস্যা কাটিয়ে উঠতে স্পিচ থেরাপিও অত্যন্ত কার্যকর।

ওষুধ, ব্যায়াম কিংবা ফিজিওথেরাপিতে আশানুরূপ উন্নতি না হলে ‘ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন’ (ডিবিএস) নামক অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের গভীরে অতি ক্ষুদ্র একটি ইলেকট্রোড স্থাপন করা হয়, যা রোগীর বুকে স্থাপিত একটি পেসমেকারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই পেসমেকারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রায় বৈদ্যুতিক স্পন্দন মস্তিষ্কে পাঠানো হয়, যা রোগীর হাত-পায়ের কাঁপুনি ও পেশির জড়তা কমাতে সহায়তা করে। এর ফলে ওষুধের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসে এবং রোগী দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

অধ্যাপক ডা. সুভাষ কান্তি দে
এমবিবিএস, এমডি (নিউরোলজি)
ফেলো ইন ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি অ্যান্ড স্ট্রোক (ইন্ডিয়া)
স্ট্রোক অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট
প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।