স্মৃতিভ্রম বার্ধক্যের লক্ষণ নাকি রোগ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতিশক্তি কিছুটা লোপ পেতে শুরু করে। কেউ হয়তো ভুলে যান চশমা কোথায় রেখেছেন, কারো হয়তো পরিচিতজনের নাম মনে করতে একটু সময় লাগে। কিছুক্ষণ পর আপনাআপনিই আবার সব মনে পড়ে যায়। এটি বার্ধক্যের স্বাভাবিক লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু যদি এমন হয়, কোনো তথ্য একবার ভুলে গেলে তা আর একেবারেই মনে পড়ে না, গুছিয়ে কথা বলতে কষ্ট হয়, অতি পরিচিতজনকেও চিনতে অসুবিধা হয় তাহলে সেটি আর স্বাভাবিক বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি স্নায়বিক জটিলতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিমেনশিয়া’ বা স্মৃতিভ্রম।

ডিমেনশিয়া কী
মূলত ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের বিভিন্ন সমস্যার কারণে সৃষ্ট উপসর্গ। এটি এমন একটি স্নায়বিক সমস্যা, যা ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের নাম হিপোক্যাম্পাস, যাকে বলা হয় স্মৃতির ভান্ডার। মূলত এই অংশটিই নতুন নতুন স্মৃতি তৈরি এবং তা সংরক্ষণ করে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই হিপোক্যাম্পাস অংশটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একপর্যায়ে শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্ক আর নতুন কোনো তথ্য বা স্মৃতি গুছিয়ে রাখতে পারে না। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি হ্রাস পায় এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। বয়স যত বাড়তে থাকে, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও তত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত ৬০ বছর বয়সের পর থেকেই এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শুধু স্মৃতিশক্তিই নষ্ট হয়ে যায় না, বরং তাঁর আচরণ এবং ব্যক্তিত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সমস্যার শুরুতে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়—
- সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বা তথ্য ভুলে যাওয়া।
- প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা বা ভুল জায়গায় রাখা।
- পরিচিত রাস্তায় হাঁটা কিংবা গাড়ি চালানোর সময় পথ হারিয়ে ফেলা।
- সময়ের হিসাব রাখতে না পারা।
- কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগা।
- কথা বলতে গিয়ে উপযুক্ত শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
- সারাক্ষণ রাগ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতায় ভোগা।
- অপ্রাসঙ্গিক আচরণ করা।
- সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই লক্ষণগুলো আরও তীব্র হয় এবং একপর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। রোগটি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন রোগী—
- পরিবারের সদস্য বা কাছের মানুষদের চিনতে পারেন না।
- চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
- মলমূত্র ত্যাগের নিয়ন্ত্রণ লোপ পায়।
- নিজে নিজে খাবার খাওয়া বা পানি পান করতে অসুবিধা হয়।
- খিটখিটে মেজাজ বা আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারেন, যা রোগী এবং তাঁর আশপাশের সবার জন্যই কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।
ডিমেনশিয়ার ধরন ও কারণ
ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত এবং প্রধান ধরন হলো ‘আলঝেইমার ডিজিজ’, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে, আলঝেইমারের মূল কারণগুলোর একটি হলো মস্তিষ্কে ‘অ্যামিলয়েড বিটা’ নামক এক বিশেষ ধরনের প্রোটিনের উপস্থিতি। এই প্রোটিন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের চারপাশে জমা হয়ে একধরনের আস্তরণ তৈরি করে, যার ফলে কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একপর্যায়ে তা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। আলঝেইমার ছাড়াও ডিমেনশিয়ার আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ধরন রয়েছে, যেমন—মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন

অধ্যাপক ডা. মোঃ রেজাউল করিম তালুকদার (রঞ্জু)
এমবিবিএস (ঢাকা), বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (নিউরোলজি)
এমএসিপি, এফএসিপি (আমেরিকা), এফআরসিপি (গ্লাসগো-ইংল্যান্ড)
সদস্য, আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজি
অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
মেডিসিন ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড লি. (ডায়াগনস্টিকস), ময়মনসিংহ