অটিজম এবং এডিএইচডি : স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা ও প্রতিকার
অটিজম ও এডিএইচডি—উভয়ই শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশজনিত বা স্নায়বিক সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অসচেতনতার কারণে এই সমস্যাগুলোকে সাধারণ জেদ, অবাধ্যতা বা চঞ্চলতা ভেবে ভুল করা হয়। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয় এবং শিশুর ভবিষ্যৎবিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের সমাজে অটিজম এবং এডিএইচডি নিয়ে একসময় অনেক ভুল ধারণা ও কুসংস্কার ছিল। কিন্তু বর্তমানে সচেতনতা বাড়ার ফলে এতে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিৎসার পথ সুগম হচ্ছে।

অটিজম ও এডিএইচডি কী
অটিজম : শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যার নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার। স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও বৃদ্ধির অস্বাভাবিকতার জন্য এই সমস্যা হয়ে থাকে। এতে আক্রান্ত হলে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ঘটলেও, মানসিকভাবে ততটা বেড়ে ওঠে না। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, অস্পষ্ট উচ্চারণ কিংবা কথা না বলার মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। সামষ্টিকভাবে একে অটিজম বলা হয়। সাধারণত ছেলে বাচ্চাদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি। শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যেই এর লক্ষণ স্পষ্ট হতে থাকে।
এডিএইচডি : অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডারের সংক্ষিপ্ত রূপ এডিএইচডি। শিশুর অতি চঞ্চলতা এবং অমনোযোগজনিত এই সমস্যাটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ না হওয়ার ফলাফল। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। অতিচঞ্চলতা এবং হুটহাট কাজ করে ফেলার প্রবণতাও তাদের মধ্যে বেশি দেখা দেয়। এডিএইচডি-আক্রান্ত শিশুরা অনেক সময় মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও কেবল মনোযোগের অভাবে পড়াশোনা বা দৈনন্দিন কাজে পিছিয়ে পড়ে। শিশুর বয়স ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যেই এর লক্ষণ প্রকাশ পায়।
লক্ষণ ও উপসর্গ
এই দুই স্নায়বিক সমস্যার লক্ষণগুলো ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে নিচের সাধারণ উপসর্গগুলো খেয়াল করা জরুরি:
অটিজমের প্রধান লক্ষণ :
- এক থেকে দেড় বছর বয়সের মধ্যে কোনো অর্থবহ শব্দ কিংবা অন্তত বা, দা, না ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ না করা।
- শিশুর ধৈর্য কম থাকা এবং দ্রুত মনোযোগ হারিয়ে ফেলা।
- সমবয়সীদের সাথে না মেশা এবং একা থাকার অভ্যাস।
- নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে না পারা।
- একই কাজ বা শব্দ বারবার করা। যেমন—ভিন্ন ভিন্ন খেলনা দিলেও একই নিয়মে খেলা।
- দুই শব্দের বাক্য দুই বছর বয়সেও তৈরি করতে না পারা।
- কথা বলায় জড়তা কিংবা কথা না বলা।
- নিজের প্রয়োজন বা কষ্টের কথা ইশারা বা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে না পারা।

এডিএইচডির প্রধান লক্ষণ :
- শিশুর মধ্যে খুব অস্থিরতা থাকে, হাত-পা ছুড়তে থাকে।
- এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। কোনো কারণ ছাড়াই ছোটাছুটি করে।
- কোনো কাজ শেষ করার আগেই অন্য কাজ শুরু করে। কারো সঙ্গে কথোপকথনের মাঝখানে হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।
- বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। বইয়ের একটা পৃষ্ঠা পড়তে গিয়ে দুই-তিনবার মনোযোগ হারিয়ে ফেলে কিংবা অন্য কিছুর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়।
- নিজের দরকারি জিনিসপত্র যেমন— বই, পেনসিল, খেলনা বারবার হারিয়ে ফেলে।
শিশুর মধ্যে খুব অস্থিরতা থাকে, হাত-পা ছুড়তে থাকে।
এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না। কোনো কারণ ছাড়াই ছোটাছুটি করে।
কোনো কাজ শেষ করার আগেই অন্য কাজ শুরু করে। কারো সঙ্গে কথোপকথনের মাঝখানে হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়।
বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। বইয়ের একটা পৃষ্ঠা পড়তে গিয়ে দুই-তিনবার মনোযোগ হারিয়ে ফেলে কিংবা অন্য কিছুর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়।
নিজের দরকারি জিনিসপত্র যেমন— বই, পেনসিল, খেলনা বারবার হারিয়ে ফেলে।
অটিজম এবং এডিএইচডি সমস্যায় কী করবেন
শিশুর অটিজম এবং এডিএইচডির লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
অটিজম নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে
অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের জন্য থেরাপিই হলো প্রধান চিকিৎসা। এর উদ্দেশ্য শিশুকে সবার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শেখানো এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাবলম্বী করে তোলা।
বিহেভিয়ার থেরাপি : এই পদ্ধতিতে শিশুর প্রতিটি আচরণকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর শিশুর ভালো কাজগুলোকে পুরস্কারের মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয় এবং ক্ষতিকর বা নেতিবাচক আচরণগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে শিশু নতুন কিছু শিখতে এবং দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী হয়।
স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি : অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশু দেরিতে কথা বলে বা একেবারেই কথা বলে না। এই থেরাপির মাধ্যমে শিশুকে শব্দ উচ্চারণ, বাক্যের গঠন এবং অন্যের কথা বোঝার কৌশল শেখানো হয়। যারা কথা বলতে পারে না, তাদের জন্য পিকচার এক্সচেঞ্জ কমিউনিকেশন সিস্টেম বা ছবির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
অকুপেশনাল থেরাপি : এই থেরাপির মূল লক্ষ্য শিশুকে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করা। ব্রাশ করা, পোশাকের বোতাম লাগানো, নিজের হাতে খাবার খাওয়া এবং কলম ধরার মতো সূক্ষ্ম কাজগুলো এই থেরাপির মাধ্যমে শেখানো হয়।
শিশুর এডিএইচডি সমস্যায় করণীয়
এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের অস্থিরতা কমানো এবং মনোযোগ বাড়ানোর জন্য থেরাপির কৌশলগুলো অটিজমের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হয়। পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বিহেভিয়ার মডিফিকেশন থেরাপি ও কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি : এ পদ্ধতিতে পয়েন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। যেমন—একটি কাজ মনোযোগ দিয়ে শেষ করলে শিশু একটি স্টার পাবে। আর কয়েকটি স্টার একসাথে করে সে তার প্রিয় কোনো খেলনা বা কার্টুন দেখার সুযোগ পাবে। এটি তাদের কাজে স্থির হতে সাহায্য করে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হয়। এটি শিশুকে নিজের চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। হুট করে কোনো কাজ করে ফেলার আগে ভেবেচিন্তে করার কৌশল শেখানো হয়।
অকুপেশনাল থেরাপি : এ পদ্ধতিতে কাজে মনোযোগ সৃষ্টি করা হয়। নিজের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিজে করা, মনোযোগ দিয়ে পুরো কাজ শেষ করা এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যায়ামের কৌশল শেখানো হয় এবং অভ্যস্ত করা হয়। এগুলো তাদের মস্তিষ্কের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে।
অভিভাবকের করণীয় : কীভাবে শিশুকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হয় এবং তার অবাধ্যতাকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়, তা মা-বাবার জানা জরুরি।

ডা. নাজনীন আক্তার (রুবী)
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (শিশু)
এফসিপিএস (শিশু নিউরোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট)
সহযোগী অধ্যাপক, শিশু নিউরোলজি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
শিশু নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল