অনিদ্রা যেভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে
শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। আমরা অনেকেই মনে করি, ঘুম মানে কেবল শরীরের বিশ্রাম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘুম আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সচল ও স্বাভাবিক রাখার এক অপরিহার্য প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের অভাব কেবল ক্লান্তিই নয়, বরং স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্নায়বিক জটিলতারও ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ সামান্য সচেতনতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেই পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা সম্ভব, যা মস্তিষ্ককে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে অতি জরুরি।

অনিদ্রার কারণ কী
মস্তিষ্কের নিউরোহরমোনাল অসামঞ্জস্য. অনিদ্রার অন্যতম মূল কারণ। এ ছাড়া শারীরিক, মানসিক ও পরিবেশগত কিছু কারণ রয়েছে।
যেমন—
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা।
- গুরুতর কোনো মানসিক আঘাত বা ট্রমা- পরবর্তী পরিস্থিতি।
- অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস এবং এর ফলে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে ব্যাঘাত।
- ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়া।
- শোবার ঘরে অতিরিক্ত শব্দ, উজ্জ্বল আলো কিংবা অস্বস্তিকর তাপমাত্রা।
- সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা, কফি, ধূমপান ও মদ্যপান।
- ঘুমানোর আগে টেলিভিশন, স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার।
- দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা যেমন—বাতব্যথা, অ্যাজমা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, থাইরয়েডের সমস্যা, হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ প্রভৃতি।
- নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
অনিদ্রার লক্ষণগুলো জেনে নিই
সাধারণত সপ্তাহে তিন দিন বা তার বেশি সময় পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তাকে অনিদ্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
- রাতে সহজে ঘুম না আসা বা ঘুমাতে দীর্ঘ সময় লাগা।
- মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং পুনরায় ঘুমাতে সমস্যা হওয়া।
- খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাববোধ করা।
- ঘুম থেকে ওঠার পর ক্লান্ত লাগা এবং সারা দিন অবসাদ অনুভব করা।
- দিনের বেলা খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগহীনতা এবং ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেওয়া।

অনিদ্রার কারণে নিঃশব্দে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক
ঘুমন্ত অবস্থায়ও আমাদের মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় থাকে না। ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কে ‘গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। গভীর ঘুমের সময় এই সিস্টেমটি সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কোষ থেকে ক্ষতিকর প্রোটিন ও বিপাকীয় বর্জ্য পরিষ্কার করে স্নায়ুতন্ত্রকে পুনর্গঠিত করে এবং সারা দিনের স্মৃতি জমা করে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা এই পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, যার ফলে মস্তিষ্কে নিচের পরিবর্তনগুলো ঘটে—
স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি : যাঁরা নিয়মিত ৬ ঘণ্টার কম ঘুমান, তাঁদের মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক হারে ক্ষতিকর প্রোটিন ও বিষাক্ত পদার্থ জমতে শুরু করে, যা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া, আলঝেইমারস, পারকিনসন এবং স্ট্রোকের মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস : ঘুমের মধ্যেই মস্তিষ্ক সারা দিনের নতুন তথ্যগুলো স্থায়ী স্মৃতি হিসেবে জমা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার কারণে মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশের কোষ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। ফলে আমাদের চিন্তা করা বা মনে রাখার স্নায়বিক সংযোগগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক কাজ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
মস্তিষ্কের কোষের অকালমৃত্যু : পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে নিউরনের সংযোগস্থল বা সিন্যাপসগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি মস্তিষ্কের কিছু কোষ চিরতরে অকেজো হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
মস্তিষ্কের প্রদাহ ও অকাল বার্ধক্য : দীর্ঘদিনের অনিদ্রা মস্তিষ্কে একধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে, যা মস্তিষ্কের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে।
মানসিক অস্থিরতা : ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ‘অ্যামিগডালা’ অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অনিদ্রায় ভোগা ব্যক্তি অতি সহজেই মেজাজ হারান, খিটখিটে হয়ে পড়েন কিংবা তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগেন।
ব্রেন ফগ : রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরদিন সকালে মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। মাথা ভার হয়ে থাকে। মাথার ভেতর কুয়াশা জমে থাকার মতো একধরনের অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি হয়। একে ‘ব্রেন ফগ’ বলে। এর ফলে জটিল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা কোনো কাজে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
যৌনক্ষমতা : দীর্ঘদিনের অনিদ্রার ফলে যৌনক্ষমতা হ্রাস পায়।
মস্তিষ্ক সুরক্ষিত রাখতে সুনিদ্রার উপায়
- ছুটির দিনসহ প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো পরিহার করুন।
- ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগেই রাতের খাবার সম্পন্ন করুন।
- ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে থেকে মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার কিংবা টিভি দেখা থেকে বিরত থাকুন।
- রাতে অতিরিক্ত চা, কফি, ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
- শোবার ঘরটি অন্ধকার, শান্ত ও শীতল রাখুন।
- আরামদায়ক বিছানা ও বালিশ নিশ্চিত করুন।
- ঘুমানোর সময় সারা দিনের দুশ্চিন্তা, সমস্যা কিংবা আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখুন।
- মনকে শান্ত করতে ঘুমানোর আগে হালকা গরম পানিতে গোসল, পছন্দের বই পড়া, ডায়েরি লেখা, প্রার্থনা বা ইয়োগা করতে পারেন।
- বিছানায় শুয়ে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না এবং বারবার ঘড়ি দেখবেন না। এতে মানসিক চাপ বেড়ে ঘুম আরও বিলম্বিত হয়।
- স্লিপ অ্যাপনিয়ার ঝুঁকি কমাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং চিত হয়ে না শুয়ে একপাশে কাত হয়ে শোয়ার অভ্যাস করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

অধ্যাপক ডা. মোঃ জাকির হোসেন সরকার
এমবিবিএস, ডিটিসিডি, এমডি (চেস্ট)
বক্ষব্যাধি, স্লিপ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
প্রাক্তন অধ্যাপক,
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
সিনিয়র কনসালট্যান্ট (বক্ষব্যাধি ও স্লিপ মেডিসিন)
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।