বেলস পালসি বা মুখ বেঁকে যাওয়া
সকাল সাতটা। ৪০ বছর বয়সী সালাহউদ্দিন সাহেব প্রতিদিনের মতো দাঁত ব্রাশ করছিলেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, কুলি করতে গিয়ে মুখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও, মুখ ধোয়ার পর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন। দেখলেন, তাঁর মুখের বাম পাশটা ঝুলে একদিকে বেঁকে গেছে। হাসতে গেলে মুখের এক পাশ আর কাজ করছে না। এমনকি বাম দিকের চোখটিও তিনি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছেন না। আতঙ্কিত হয়ে তিনি ধরে নিলেন, নিশ্চয়ই স্ট্রোক হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে, এটি স্ট্রোক নয়, বরং বেলস পালসি। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা হলে এবং নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিলে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন।
বেলস পালসি আসলে কী
আমাদের মুখমণ্ডলের প্রতিটি অভিব্যক্তি বা ভাবভঙ্গি নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের সপ্তম ক্রেনিয়াল নার্ভ বা ফেসিয়াল নার্ভের মাধ্যমে। এই স্নায়ুটি মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে কানের ঠিক নিচ দিয়ে মুখের দুপাশে প্রবেশ করে। হাতের তালু থেকে বের হওয়া পাঁচ আঙুলের শাখার মতো এই স্নায়ুটি আমাদের কপাল, চোখ, নাক, ঠোঁট এবং চিবুকের পেশিগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত এই নার্ভের কারণেই আমাদের মুখের মাংসপেশির নড়াচড়া স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু কোনো কারণে এই নার্ভটি ফুলে গেলে, প্রদাহের সৃষ্টি হলে কিংবা নার্ভটি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেললে মুখের পেশিগুলো অবশ হয়ে পড়ে এবং মুখ একদিকে বেঁকে যায়। এই অবস্থাকেই ‘বেলস পালসি’ বা ‘ফেসিয়াল পালসি’ বলা হয়।
কেন হয়
কিছু সুনির্দিষ্ট ভাইরাসের সংক্রমণ এবং পরিবেশগত প্রভাবের কারণে বেলস পালসি হয়ে থাকে। বিশেষ করে হার্পিস সিমপ্লেক্স এবং হার্পিস জোস্টার ভাইরাসের সংক্রমণে ফেসিয়াল নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি থাকে। সাধারণত আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় অর্থাৎ শীতের শুরুতে কিংবা শীত শেষে যখন গরম শুরু হয়, সেই সময়টিতে মানুষ বেলস পালসিতে বেশি আক্রান্ত হন। ভাইরাসের পাশাপাশি সারকয়েডোসিস নামক প্রদাহজনিত রোগ, ঠান্ডা লাগা, কানে ইনফেকশন, লাইম ডিজিজ—এসব কারণেও বেলস পালসি হতে পারে।
বেলস পালসিতে আক্রান্তের ঝুঁকি যাঁদের বেশি

যেকোনো বয়সী নারী-পুরুষ বেলস পালসিতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে কিছু বিশেষ শারীরিক অবস্থায় এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিসে ভুগছেন, যাঁদের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছেন তাঁদের ক্ষেত্রে ফেসিয়াল নার্ভ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। এ ছাড়া, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস কিংবা সন্তান প্রসবের ঠিক পরের এক সপ্তাহ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বা জেনেটিক প্রবণতাকেও এই রোগের একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রধান লক্ষণসমূহ
বেলস পালসির উপসর্গ হঠাৎ করেই দেখা দেয়। উল্লেখযোগ্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- হাসতে গেলে মুখ এক দিকে বেঁকে যাওয়া।
- আক্রান্ত পাশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারা।
- চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত পানি পড়া।
- কপাল ভাঁজ করতে বা ভ্রু কোঁচকাতে না পারা।
- কুলি বা পানি পান করার সময় পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া।
- খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া।
- স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা কমে যাওয়া।
- কথা বলতে কষ্ট হওয়া।
- কানের পেছনে বা চোয়ালে ব্যথা অনুভূত হওয়া।
স্ট্রোক নাকি বেলস পালসি : বুঝবেন কীভাবে
হঠাৎ করে মুখ বেঁকে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বেশির ভাগ মানুষই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। মনে করেন, স্ট্রোক করেছেন। তবে বেলস পালসি ও স্ট্রোকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে মুখের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অংশও আক্রান্ত হতে পারে। রোগীর শরীরের এক পাশের হাত–পা হঠাৎ দুর্বল বা অবশ হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় কথা জড়িয়ে যায়, চোখে ঝাপসা দেখা দেয়, এমনকি রোগী অচেতনও হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, বেলস পালসির প্রধান উপসর্গই হলো মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া। ডান পাশে বেলস পালসি হলে মুখ বাঁ দিকে বেঁকে যায়, আর বাঁ পাশে হলে মুখ ডান দিকে বেঁকে যায়। এ ক্ষেত্রে মুখের পুরো এক পাশ কপালসহ আক্রান্ত হয়, শরীরের অন্য কোনো অংশ নয়। হাত–পা দুর্বল হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা চেতনা হারানোর মতো লক্ষণও থাকে না। তবে স্ট্রোক হোক বা বেলস পালসি, ওপরের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
এ রোগের চিকিৎসায় ফেসিয়াল নার্ভের ফোলা ভাব বা প্রদাহ কমাতে সাধারণত স্বল্প মেয়াদে কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেলে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধও ব্যবহৃত হয়। তবে, এই রোগ নিরাময়ে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নার্ভের প্রদাহ কমাতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় আলট্রাসাউন্ড থেরাপির পাশাপাশি ইলেকট্রোথেরাপি এবং ম্যানুয়াল থেরাপির সমন্বয়ে এই চিকিৎসা করা হয়। পেশিকে পুনরায় সচল করতে সফট টিস্যু মোবিলাইজেশন, প্রোপায়রোসেপটিভ নিউরোমাস্কুলার ফেসিলিটেশন অ্যাপ্রোচ এবং মোটর পয়েন্ট স্টিমুলেশনের মতো আধুনিক পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া পেশির শক্তি বাড়াতে অ্যাকটিভ অ্যাসিস্টেড ও স্ট্রেনদেনিং এক্সারসাইজ ভালো কাজ করে।

দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হিসেবে বেলুন ফোলানো, শিস দেওয়ার চেষ্টা করা কিংবা চুইংগাম চিবানোর মতো ফেসিয়াল ব্যায়ামগুলো রোগীকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সাহায্য করে। বেলস পালসিতে আক্রান্ত প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী সঠিক পদ্ধতিতে ফিজিওথেরাপি এবং সময়মতো স্টেরয়েড সেবনে দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে অল্পসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে সামান্য কিছু দুর্বলতা বা মুখ সামান্য বাঁকা থেকে যেতে পারে। এক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্যসহকারে ফিজিওথেরাপি চালিয়ে গেলে এই সমস্যাও ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়।
মেনে চলুন কিছু নিয়মকানুন
- ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে দূরে থাকুন।
- ঠান্ডাজাতীয় খাবার পরিহার করুন।
- ভাইরাল সংক্রমণ প্রতিরোধ করুন।
- ঠান্ডা, ফ্লু, মুখে বা কানে ইনফেকশন কিংবা বা অন্য কোনো ভাইরাসজনিত অসুস্থতা হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
- ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

ডা. বিপ্লব কুমার দাস
এমবিবিএস, এমডি (নিউরোলজি), বিএসএমএমইউ
সহযোগী অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ
খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, খুলনা
নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড লিমিটেড (ডায়াগনস্টিক), খুলনা