ডায়াবেটিক রোগীদের স্নায়ু সুরক্ষায় করণীয়
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সাধারণ অথচ অত্যন্ত মারাত্মক একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়াবেটিস। এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা নীরবে শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমাদের শরীরের সকল অনুভূতি-উদ্দীপনা ও নড়াচড়া সচল রাখে যে স্নায়ুতন্ত্র, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ক্ষতিকর প্রভাব সেখানেও পড়ে। দীর্ঘদিন রক্তে অতিরিক্ত শর্করা থাকলে রক্তনালির দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। স্নায়ুতে রক্ত সরবরাহকারী ক্ষুদ্র ধমনিগুলো সংকীর্ণ হয়ে যায়। ফলে স্নায়ুগুলো পর্যাপ্ত পুষ্টি ও অক্সিজেন পায় না। এতে স্নায়ুকোষগুলোর সুরক্ষা আবরণ নষ্ট হয়ে যায় এবং পারস্পরিক সংযোগ ও স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদান ব্যাহত হয়। এর ফলেই শুরু হয় নানা ধরনের স্নায়বিক সমস্যা, যা ‘ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি’ নামে পরিচিত। হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাব থেকে শুরু করে স্থায়ী অসাড়তার মতো নানা জটিলতা এই রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। তবে সচেতনতা এবং সময়মতো স্নায়ু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এসব জটিলতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির ধরন ও লক্ষণ
রক্তে শর্করার দীর্ঘমেয়াদি আধিক্য শরীরের কোন অংশের স্নায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তার ওপর ভিত্তি করে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথিকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ধরনের উপসর্গ ভিন্ন।

১. পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি : মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড থেকে আমাদের হাত, পা ও শরীরের অন্যান্য অংশে সংকেত আদান-প্রদান করে যে স্নায়ু, তাকে বলে পেরিফেরাল স্নায়ু। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে যখন এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তাকে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি বলা হয়। ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬ থেকে ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিক রোগী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ধরনের স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
লক্ষণ ও উপসর্গ : আক্রান্ত স্থানে ঝিনঝিন ভাব, সুই ফোটানোর মতো অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া এবং পেশির দুর্বলতা। এটি সাধারণত পায়ের পাতা ও আঙুল থেকে শুরু হয় এবং পরে হাতের কবজি ও আঙুলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থান পুরোপুরি অসাড় হয়ে যায়। এর ফলে রোগী পায়ে কোনো আঘাত পেলে বা কেটে গেলে বুঝতে পারেন না, যা থেকে পরে মারাত্মক ইনফেকশন বা ‘ডায়াবেটিক ফুট আলসার’ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
২. অটোনমিক নিউরোপ্যাথি : আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসমূহ যেমন—হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী, অন্ত্র, মূত্রাশয় প্রভৃতির কাজ নিয়ন্ত্রিত হয় বিশেষ কিছু স্নায়ুর মাধ্যমে। ডায়াবেটিস যখন এই অংশগুলোর স্নায়ুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন তাকে অটোনমিক নিউরোপ্যাথি বলে।
প্রধান লক্ষণসমূহ : হজমে সমস্যা, বমি বমি ভাব, হঠাৎ কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়া। এ ছাড়া মূত্রাশয় বা অন্ত্রের সমস্যা, অতিরিক্ত বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ঘাম হওয়া, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ এবং বিশ্রামের সময়ও দ্রুত হৃৎস্পন্দনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
৩. প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি : চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ডায়াবেটিক অ্যামিওট্রফি’ বলা হয়। এটি সাধারণত বয়স্ক বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। এটি মূলত ঊরু, নিতম্ব বা হিপের স্নায়ুকে আক্রান্ত করে।
লক্ষণ ও উপসর্গ : আক্রান্ত স্থানে হঠাৎ তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া এবং মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া। ব্যথার তীব্রতায় রোগীর বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। অনেক সময় আক্রান্ত দিকের শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
৪. ফোকাল নিউরোপ্যাথি : অন্যান্য নিউরোপ্যাথির লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেলেও ফোকাল নিউরোপ্যাথি সাধারণত হঠাৎ করেই দেখা দেয়। এটি এমন একটি সমস্যা, যেখানে শরীরের নির্দিষ্ট কোনো একটি স্নায়ু বা স্নায়ুর একটি ছোট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন— মাথা, চোখ, হাতের কবজি বা কার্পাল টানেল কিংবা পায়ের কোনো বিশেষ অংশ।
প্রধান লক্ষণসমূহ : শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অংশে তীব্র ব্যথা, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, ডাবল ভিশন (একটি জিনিসকে দুটি দেখা), হাত বা আঙুলে অসাড়তা বা ঝিনঝিন অনুভূতি, পায়ের পাতা বা কোমরে ব্যথা, মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা।

স্নায়ু সুরক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
ডায়াবেটিক রোগীদের স্নায়ু সুস্থ রাখতে কিছু নিয়ম মেনে চলা অপরিহার্য—
- যেকোনো স্নায়ুজনিত সমস্যা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
- নিয়মিত গ্লুকোমিটারের সাহায্যে রক্তে শর্করার মাত্রা এবং অন্তত তিন মাস পরপর ‘এইচবিএওয়ান সি’ পরীক্ষা করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন সেবন নিশ্চিত করুন।
- ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথিতে পায়ের অনুভূতি কমে যায়। ফলে ছোটখাটো ক্ষত থেকেও বড় সংক্রমণ বা গ্যাংগ্রিন হতে পারে। তাই প্রতিদিন আয়নার সাহায্যে পায়ের তলা পরীক্ষা করুন। কোনো লাল ভাব, ফোসকা বা ক্ষত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সব সময় নরম ও আরামদায়ক জুতা পরুন।
- উচ্চ রক্তচাপ ও অতিরিক্ত কোলেস্টেরল স্নায়ুর রক্ত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায়। লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার কমিয়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখুন।
- ধূমপান রক্তনালিকে সংকুচিত করে এবং স্নায়ুর ক্ষতি ত্বরান্বিত করে। তাই স্নায়ু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য পরিহার করুন।

- খাদ্যতালিকায় সুষম, পুষ্টিকর ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। স্নায়ু সুরক্ষায় ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২ অত্যন্ত কার্যকর।
- স্নায়ু সচল ও সজীব রাখতে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- যদি ইতিমধ্যে হাত-পায়ে ব্যথা বা অবশ ভাব শুরু হয়ে থাকে, তবে একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন। ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশনায় বিশেষ কিছু ব্যায়াম করতে পারেন। যেমন— মাংসপেশি সচল রাখতে আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ, নমনীয়তা ও রক্তসঞ্চালন বাড়াতে স্ট্রেচিং এবং পেশিশক্তি বৃদ্ধিতে গ্রেডেড ওয়েট প্রোগ্রেসন অত্যন্ত কার্যকর। স্নায়ুর সমস্যার কারণে অনেকের হাঁটার স্বাভাবিক ভঙ্গি ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে গেট ট্রেনিং হাঁটার ধরন ঠিক করতে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ডা. মারুফা মোস্তারী
এমবিবিএস, এফসিপিএস (এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম)
এমএসিই (ইউএসএ)
সহকারী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা
ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।