মৃগীরোগ নিয়ে কুসংস্কার ও সঠিক চিকিৎসা
আধুনিক সভ্যতার এই যুগেও এপিলেপসি বা মৃগীরোগ নিয়ে মানুষ যতটা না আতঙ্কিত, তার চেয়ে বেশি কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার অন্ধকারে নিমজ্জিত। অন্ধবিশ্বাস ও অজ্ঞতার এই অন্ধকার অনেক সময় রোগটির চেয়েও বেশি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। কেউ একে ভাবেন ‘দৈব অভিশাপ’, কেউবা একে তুলনা করেন ‘অশুভ আত্মা বা জিনের আছর’ হিসেবে। আর এই ভুল ধারণার শিকার হয়ে অসংখ্য মৃগীরোগী আধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসা থেকে হন বঞ্চিত। সঠিক ধারণা ও সচেতনতার অভাবে তারা শুধু অবহেলা ও সামাজিক লাঞ্ছনারই শিকার হন না, বরং এক মানবেতর ও বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে—মৃগী কোনো অভিশাপ নয়, বরং মস্তিষ্কের একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্নায়বিক সমস্যা মাত্র।
মৃগীরোগ কী
মৃগীরোগ মূলত স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতাজনিত এক বিশেষ শারীরিক অবস্থা। আমাদের মস্তিষ্ক কোটি কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরনের সমন্বয়ে গঠিত। এই কোষগুলোর মধ্যে প্রবাহিত রাসায়নিক সংকেত বা বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমেই আমাদের প্রতিটি শারীরিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কিন্তু কোনো কারণে মস্তিষ্কের এই স্বাভাবিক সংকেত প্রবাহে হঠাৎ ব্যাঘাত ঘটলে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে একধরনের সাময়িক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আর এর ফলেই একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের শরীরে হঠাৎ খিঁচুনি, কাঁপুনি ও শারীরিক অসাড়তাসহ নানা ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ ও লক্ষণ প্রকাশ পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকেই ‘মৃগীরোগ’ বা ‘এপিলেপসি’ বলে।

মৃগীরোগের নানাবিধ লক্ষণ
- হঠাৎ শরীরের কোনো অংশে খিঁচুনি শুরু হওয়া এবং পর্যায়ক্রমে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া।
- শরীর শক্ত হয়ে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যাওয়া এবং জ্ঞান হারানো।
- অনেকের ক্ষেত্রে খিঁচুনি শুরু হওয়ার আগে শরীর ঝিনঝিন করা এবং কোনো অদ্ভুত গন্ধ ও স্বাদ অনুভব করা।
- হাত থেকে হঠাৎ করে কিছু ছিটকে পড়া।
- হাত, পা ও মুখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া শুরু হওয়া।
- পুরো শরীর কিংবা হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে থাকা।
- খিঁচুনি চলাকালীন মুখ দিয়ে ফেনা বের হওয়া।
- দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়া।
- অনেকের ক্ষেত্রে খিঁচুনি চলাকালীন মলমূত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
- চোখের মণি ওপরের দিকে উঠে যাওয়া কিংবা চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা।
- অনেক সময় বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা।
উল্লিখিত যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিক করণীয় হিসেবে মৃগীরোগীকে শক্ত মেঝেতে বা সমতল জায়গায় শুইয়ে দিতে হবে এবং মাথার নিচে নরম কাপড় বা বালিশ দিতে হবে। রোগীকে একপাশে কাত করে শোয়াতে হবে, যাতে লালা বা থুতু মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। রোগীর মুখে জোর করে পানি, খাবার বা চামচ দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না। আশেপাশে কোনো ধারালো বস্তু, আগুন বা পানি থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে যাতে রোগী আঘাত না পান। রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি খিঁচুনি দীর্ঘ সময় বা বারবার হতে থাকে তাহলে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।
মৃগীরোগ নিয়ে প্রচলিত যত ভ্রান্ত ধারণা
আধুনিক সভ্যতার এই যুগেও মৃগীরোগ নিয়ে আমাদের সমাজে নানা অমূলক ধারণা প্রচলিত। অনেকেই এই রোগকে ‘জিনের আছর’ বা ‘অশুভ বাতাসের প্রভাব’ বলে মনে করেন। ফলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের মতো অপচিকিৎসার আশ্রয় নেওয়া হয়, যা রোগীর মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। খিঁচুনি চলাকালীন নাকে নোংরা জুতো বা মোজা চেপে ধরা এবং মুখে চামচ দেওয়া আরও একটি প্রচলিত কুসংস্কার; যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তো নেই, বরং এর ফলে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেকেই আবার মৃগীরোগকে ছোঁয়াচে মনে করে রোগীর সাথে মিশতে চান না। তাকে পাগল মনে করেন। আক্রান্তদের বিয়ে করা উচিত নয় বলে ধারণা করেন। অনেক পরিবারে একে ‘বংশগত অভিশাপ’ বলে গণ্য করা হয় এবং মনে করা হয় যে, এই রোগ কখনো সারে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৃগী কোনো ছোঁয়াচে রোগ বা অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্নায়বিক সমস্যা। সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে একজন মৃগীরোগী শতভাগ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
মৃগীরোগের প্রকৃত কারণ
মৃগীরোগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে। যেমন—
- মৃগীরোগের পারিবারিক ইতিহাস।
- মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া।
- জন্মগতভাবে মস্তিষ্কের গঠনগত ত্রুটি।
- মস্তিষ্কে টিউমার।
- মস্তিষ্কে প্রদাহ যেমন—মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস।
- প্রসবকালীন জটিলতার কারণে শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব।
- স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ।
মৃগীরোগের সঠিক চিকিৎসা ও জীবনধারার ব্যবস্থাপনা
ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি), এমআরআই কিংবা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে মস্তিষ্কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মৃগীরোগের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। অধিকাংশ মৃগীরোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত অ্যান্টি-এপিলেপটিক ওষুধ সেবনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারেন। অ্যান্টি-এপিলেপটিক ওষুধ মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হওয়া রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণে ভারসাম্য এনে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ স্বাভাবিক রাখে। চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে ওষুধের মাত্রা কম রাখা হয় এবং ধীরে ধীরে তা বৃদ্ধি করা হয় যত দিন না খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে আসে। একপর্যায়ে রোগী ওষুধ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই ওষুধ বন্ধ করা বা ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা যাবে না। ওষুধের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে না এলে বা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, সময়মতো খাওয়াদাওয়া করা, উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলা, গোসল করা, সাঁতার কাটা, রান্না করা, গাড়ি চালানো প্রভৃতি কাজের সময় কাউকে পাশে রাখা এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা জরুরি।

ডা. কামরুল হাসান
এমবিবিএস (সিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমডি (নিউরোমেডিসিন), বিএসএমএমইউ
সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
মেডিসিন, ব্রেন স্ট্রোক, মৃগীরোগ, মাথাব্যথা, বাতব্যথা,
প্যারালাইসিস, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, চট্টগ্রাম