হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভার্টিগো কেন হয়
একজন সুস্থ মানুষ স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ তাঁর মনে হলো পায়ের নিচের মাটি দুলছে কিংবা চারপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা সব তাঁর চোখের সামনে বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছে! এই যে স্থির থেকেও নিজেকে বা চারপাশকে ঘূর্ণায়মান মনে হওয়া—চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ভার্টিগো’। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ এই সমস্যায় ভুগলেও সঠিক ধারণার অভাবে অনেকেই একে সাধারণ মাথা ঘোরা ভেবে অবহেলা করেন, যা ঠিক নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এটি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে, ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ করে তুলতে পারে রাস্তাঘাটে চলাফেরাসহ দৈনন্দিন সব কাজকর্ম।

ভার্টিগো আসলে কী
ভার্টিগো প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষাকারী মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ কানের কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার উপসর্গ। এতে রোগীর মনে হয় যেন চারপাশ ঘুরছে কিংবা শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে কষ্ট হওয়ায় নিজে পড়ে যাচ্ছেন।
ভার্টিগোর ধরন এবং প্রধান কারণসমূহ
ভার্টিগো মূলত দুই ধরনের।
১. ট্রু বা প্রকৃত ভার্টিগো : যদি কারো মনে হয় যে নিজে স্থির থাকা সত্ত্বেও চারপাশের সবকিছু দ্রুতগতিতে ঘুরছে—তখন তাকে ‘ট্রু ভার্টিগো’ বলা হয়। এ ক্ষেত্রে রোগী শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার কারণে পড়ে যেতে পারেন বা পড়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা অনুভব করেন। এর সাথে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। কারণ—
- ভার্টিগোর সবচেয়ে বড় উৎস হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ কান, যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে। কানের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ভার্টিগো হয়ে থাকে। একে আবার চার ভাগে ভাগ করা যায়।
বিনাইন প্যারোক্সিসমাল পজিশনাল ভার্টিগো (বিপিপিভি) : এটি ভার্টিগোর সবচেয়ে সাধারণ কারণ। আমাদের ভেতরের কানে থাকা ছোট ছোট ক্যালসিয়াম কণাগুলো যখন তাদের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে যায়, তখন মস্তিষ্কে ভুল সংকেত পৌঁছায়। এর ফলে হঠাৎ মাথা নাড়ালে বা শোয়া অবস্থা থেকে উঠলে ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তীব্র মাথা ঘোরার অনুভূতি শুরু হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাথা ঘোরার এই অনুভূতি মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়।
ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস : ভেস্টিবুলার নিউরাইটিস হলো কানের অভ্যন্তরীণ অংশে অবস্থিত ভেস্টিবুলার স্নায়ুর প্রদাহজনিত সমস্যা। এই স্নায়ুটি আমাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা ও নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভেস্টিবুলার স্নায়ুতে প্রদাহ সৃষ্টি হলে হঠাৎ করে এতটাই তীব্র মাথা ঘোরা শুরু হয় যে, অনেক সময় রোগীর পক্ষে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভেস্টিবুলার নিউরাইটিসের ক্ষেত্রে রোগী কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মাথা ঘোরার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
মেনিয়ার রোগ : ভেতরের কানে অতিরিক্ত তরল জমা হয়ে শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া, কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হওয়া এবং কানে চাপ অনুভব করার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। একে মেনিয়ার রোগ বলা হয়। এটি অস্বাভাবিক মাথা ঘোরা বা ভার্টিগোর অন্যতম কারণ।

ল্যাবিরিন্থাইটিস রোগ : কানের গভীরের একটি অংশের নাম ল্যাবিরিন্থ। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এই অংশে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। একে ল্যাবিরিন্থাইটিস রোগ বলে। এতে মাথা ঘোরার পাশাপাশি শ্রবণশক্তি হ্রাস, কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ এবং বমিভাব দেখা দেয়।
- মস্তিষ্কের পেছনের অংশে রক্ত চলাচলে সমস্যা হলে কিংবা বিভিন্ন রোগ যেমন— স্ট্রোক, ব্রেন টিউমার, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, গুরুতর আঘাত, মাইগ্রেন প্রভৃতি কারণে তীব্র মাথা ঘোরার সমস্যা হতে পারে।
- অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও ভার্টিগোর সমস্যা দেখা দেয়।
২. সিউডো বা ফলস ভার্টিগো
অনেক সময় হতাশা, দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও অস্থিরতা থেকে মাথার ভেতরটা হালকা লাগা, শরীর দোলা কিংবা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি দেখা দেয়, কিন্তু চারপাশ ঘোরে না। একেই ‘ফলস ভার্টিগো’ বলা হয়। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়।
ভার্টিগো ও সাধারণ মাথা ঘোরার মধ্যে পার্থক্য
সাধারণ মাথা ঘোরা ও ভার্টিগোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভার্টিগোর ক্ষেত্রে মনে হয় চারপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা বনবন করে ঘুরছে। শরীরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বমি ভাব হয়। কিন্তু সাধারণ মাথা ঘোরার ক্ষেত্রে চারপাশ ঘোরে না, মনে হয় মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকলেও মাথা ঝিমঝিম করে বা চোখে অন্ধকার লাগে। বমি ভাব সচরাচর হয় না, কিন্তু ক্লান্তি বোধ হয়।

ভার্টিগো হলে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
হঠাৎ ভার্টিগো শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন—
- মাথা ঘোরা শুরু হলে সাথে সাথে কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে বসে পড়ুন।
- মাথা ঘোরানোর সময় চোখ বন্ধ রাখুন। মাথা-ঘাড় নাড়াবেন না। অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও অনেক সময় আরাম পাওয়া যায়।
- হুট করে বসা থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়াবেন না। সব কাজ ধীরগতিতে করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- অতিরিক্ত চা, কফি, লবণ এবং ধূমপান পরিহার করুন।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

- মস্তিষ্ক বা কানে যেকোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- মাথা ও ঘাড়ের কিছু ব্যায়াম অনেক সময় মাথা ঘোরা কমাতে সাহায্য করে।
- বমি ভাব বা তীব্র মাথা ঘোরা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করতে পারেন।

ডা. সাহিদা বুলবুল
এমবিবিএস, এমডি (নিউরোলজি)
ফেলোশিপ ইন স্ট্রোক অ্যান্ড নিউরোইন্টারভেনশন (ইন্ডিয়া)
স্ট্রোক ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, নিউরোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা
চেম্বার : ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।