দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত হালকা হলেও ঝুঁকি আছে
বাংলাদেশে মস্তিষ্কে আঘাতের প্রধান কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা ও উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়া। দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এর মূলে আছে প্রধানত অসচেতনতা। যেমন—গাড়ি চালনায় অদক্ষ ড্রাইভার, বাইক চালানোর সময় হেলমেট না পরা, কিংবা দেখতে গোল বাটির মতো অকার্যকর হেলমেট পরা, রিকশার চাকার সঙ্গে ওড়না বা শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে রাস্তায় ছিটকে পড়া ও নির্মাণকাজের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা। এ ছাড়াও শারীরিক সহিংসতা বা মারামারি, সন্ত্রাসী হামলার শিকার এবং খেলাধুলাসম্পর্কিত আঘাতসহ আরো নানা কারণে মস্তিষ্ক আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। কারণ যেটিই হোক, মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় আমাদের দেশে অনেকেই প্রাণ হারান এবং বাকিদেরও দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

মাথায় আঘাত হালকা হলেও কেন এত ঝুঁকি বেশি
মানুষের মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মস্তিষ্ক দেখতে অনেকটা জেলিসদৃশ। যা মেনিনজেস নামের একটি বিশেষ পাতলা ত্রিস্তরীয় ঝিল্লি বা পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। আর এর পুরোটাই সংরক্ষিত থাকে করোটি বা খুলির ভেতর। আমরা অনেকেই মনে করি, মাথায় আঘাত পাওয়ার পর যদি রক্ত না বের হয় বা বাইরে থেকে কোনো ক্ষত দেখা না যায়, তবে হয়তো ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ জখম বাইরের জখমের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। সামান্য একটি আঘাতও মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালি ছিঁড়ে দিতে পারে কিংবা নিউরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও পরে ভয়াবহ পরিণতি
ডেকে আনে।
মাথায় আঘাতের ধরন
ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি : মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের যে ক্ষতি হয় তাকে ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি বা টিবিআই বলা হয়। এটি মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো প্রাইমারি ইনজুরি, যা আঘাত পাওয়ার ঠিক পর মুহূর্তেই ঘটে। যেমন হাড় ফেটে যাওয়া বা ব্রেন টিস্যু তুবড়ে যাওয়া। অন্যটি হলো সেকেন্ডারি ইনজুরি, যা আঘাতের কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর প্রকাশ পায়। সেকেন্ডারি ইনজুরিতে মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়ে ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে, যা সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে না পারলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও লুসিড ইন্টারভ্যাল : মাথায় আঘাতের একটি রহস্যময় দিক হলো লুসিড ইন্টারভ্যাল। অনেক সময় দেখা যায়, মাথায় আঘাত পাওয়ার পর রোগী উঠে দাঁড়ায়, স্বাভাবিকভাবে কথা বলে এবং বলে যে সে সুস্থ আছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার পর সে হঠাৎ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বা তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এটি ঘটে কারণ মাথার খুলির ভেতরে ধীরগতিতে রক্তক্ষরণ হয়ে জমাট বাঁধতে থাকে। যখন রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, তখনই কেবল লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। তাই মাথায় আঘাতের পর রোগী সুস্থ বোধ করলেও তাকে অন্তত ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা জীবন বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য।
মাথায় আঘাত পেলে কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
- যদি মাথাব্যথা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে।
- বমি বমি ভাব নয় বরং হুট করে তীব্র বেগে বমি হয়।
- যাঁদের আগে কখনো মৃগীরোগ বা খিঁচুনি ছিল না, কিন আঘাতের পর হাত-পা ঝাপটানো শুরু হয়।
- পরিবারের মানুষদের চিনতে না পারা বা অসংলগ্ন কথা বলা।
- রোগীকে যদি ডাকাডাকি করে জাগিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বা সে সারাক্ষণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকতে চায়।
- যদি নাক বা কান দিয়ে হালকা রক্ত মেশানো পানির মতো তরল নির্গত হয়। এটি মূলত সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড।
- যদি দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
মাথায় আঘাত পাওয়ার পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে কোনো টোটকা বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করবেন না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত নিউরোসার্জারি সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নিন।
মস্তিষ্কে আঘাত পেলে খুব দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হয়। এরপর পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে পুনর্বাসনব্যবস্থা ও কেন্দ্রের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পূর্ব সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

ডা. মো: আরিফ হোসেন
এমবিবিএস (ডিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এফসিপিএস (সার্জারি), এফএসিএস (আমেরিকা)
এফএমএএস (ইন্ডিয়া), ট্রেইন্ড ইন অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কপি
অ্যান্ড কলোরেক্টাল সার্জারি (চীন, ভারত)
সহকারী অধ্যাপক (ক্যাজুয়ালটি সার্জারি)
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
চেম্বার : ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।