ব্যাক পেইন কেন হয়
প্রতিকার কী

দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, ভুল ভঙ্গিতে বসা বা দাঁড়ানো প্রভৃতি কারণে যেকোনো বয়সী মানুষের কাছে ‘ব্যাক পেইন’ এখন এক নিত্যদিনের অস্বস্তিতে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যাটি মূলত দুই অংশে বিভক্ত—আপার ব্যাক বা পিঠের ওপরের অংশ এবং লোয়ার ব্যাক অর্থাৎ পাঁজরের নিচ থেকে নিতম্ব পর্যন্ত অংশ। যদিও পিঠের যেকোনো স্থানেই ব্যথা হতে পারে, তবে সাধারণত লোয়ার ব্যাক বা কোমরের নিচের অংশেই এটি বেশি অনুভূত হয়। তবে ব্যাক পেইন মানেই যে মারাত্মক কোনো রোগ, তা কিন্তু নয়। সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ব্যথা দ্রুত সেরে যায়। তাই ব্যথার কারণগুলো গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ব্যাক পেইনের কারণ

সাধারণত পেশি ও হাড়ের ভারসাম্যহীনতার কারণে ব্যাক পেইনের সমস্যা হয়ে থাকে। আমাদের মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝে কিছু বিশেষ ধরনের ডিস্ক বা চাকতি থাকে। এই চাকতির নড়চড়া বা সরে যাওয়ার কারণে পিঠ ও কোমরে ব্যথা হয়। এ ছাড়া শারীরিক পরিশ্রম কম করার ফলে পেশি দুর্বল হয়ে যায়। এই দুর্বলতার জন্য হাড়ের মাঝের ডিস্কের স্নায়ুতে চাপ পড়েও ব্যাক পেইন হতে পারে। মেরুদণ্ডের ক্ষয়, স্পন্ডাইলোসিস, সায়াটিকা, আর্থ্রাইটিস ও স্নায়ুর বিভিন্ন রোগের কারণেও ব্যাক পেইন হয়ে থাকে। আরও কিছু কারণে সমস্যাটি হতে পারে। যেমন—

  • দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা কিংবা নিচু বা কুঁজো হয়ে বসা।
  • বয়স কিংবা বংশগত কারণে হাড় ক্ষয় হওয়া।
  • হাড়ের টিবি বা যক্ষ্মা।
  • মাংসপেশি বা রগে টান লাগা।
  • ভারী জিনিস ওঠানো-নামানোর কাজ করা।
  • সংক্রমণজনিত কোনো রোগ।
  • মেরুদণ্ডে টিউমার বা প্রদাহ।
  • পিঠ বা কোমরে আঘাত লাগা।
  • ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার মেরুদণ্ডের হাড়ে ছড়িয়ে পড়া।
  • স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন।

লক্ষণ ও উপসর্গ

ব্যাক পেইনের প্রধান উপসর্গ হলো ব্যথা, যা হালকা থেকে তীব্র হতে পারে। সাধারণত নড়াচড়া করলে এই ব্যথা বেড়ে যায় এবং কোমরের বা পিঠের যেকোনো অংশে অনুভূত হতে পারে। মূলত কী কারণে ব্যাক পেইন হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। তবে ব্যাক পেইনের কিছু ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা আশঙ্কাজনক উপসর্গ রয়েছে, যা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। যেমন—

  • জ্বর।
  • দ্রুত ওজন হ্রাস।
  • হাঁচি-কাশি দিলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
  • ঘাড় থেকে নিচের দিকে ব্যথা নেমে যাওয়া।
  • কোমর থেকে নিচের অংশ দুর্বল হয়ে আসা।
  • পিঠ বা কোমর ফুলে যাওয়া কিংবা বেঁকে যাওয়া।
  • মলমূত্র নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়া।

এ ছাড়া যাঁরা আগে থেকে ক্যানসার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগছেন, বয়স ২০ বছরের কম বা ৬৫ বছরের বেশি, দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়েছেন কিংবা দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবন করছেন, এমন ব্যক্তিদের ব্যাক পেইন হলে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।

চিকিৎসা

ব্যাক পেইনের চিকিৎসা মূলত এর কারণ ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে। ভারী বস্তু তোলা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা কিংবা দাঁড়িয়ে কাজ করার কারণে ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ব্যথার স্থানে গরম সেঁক দিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বিভিন্ন ধরনের থেরাপি নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়। আর্থ্রাইটিস থেকে ব্যথা হলে সুনির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োজন। আবার হাড় ক্ষয় হয়ে থাকলে তা রোধ করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সায়াটিকার কারণে ব্যাক পেইন হলে ওষুধ ও থেরাপি উভয়ই কার্যকর। এসব পদ্ধতিতে কাজ না হলে অনেক সময় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

ব্যাক পেইন প্রতিরোধে যা করবেন

দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবেন না।
কম্পিউটারে কাজ করার সময় পিঠ ও কোমর সোজা রেখে চেয়ারে বসুন এবং কাজের ফাঁকে বিরতি নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করুন।
ভারী জিনিস তোলা ও বহনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
নিচ থেকে কিছু তোলার সময় শরীর না বাঁকিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে তুলুন।
তরকারি কাটা, কাপড় কাচা কিংবা ঘর মোছার সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখুন।
সিঁড়ি যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করুন এবং উঁচু-নিচু স্থান পরিহার করে চলুন।
বিছানায় উপুড় হয়ে শোয়ার অভ্যাস থাকলে ত্যাগ করুন।
অতিরিক্ত শক্ত কিংবা নরম বিছানা পরিহার করুন।
হাই কমোড ব্যবহার করুন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।


অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী (বিরু)

অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী (বিরু)

এমবিবিএস, এমএস (আর্থো)
ফেলো, অর্থোস্কপি অ্যান্ড রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি (ইউকে)
ফেলো, অর্থোস্কপি অ্যান্ড স্পোর্টস মেডিসিন (ইন্ডিয়া)
প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোস্কপি অ্যান্ড রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি
অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ), ঢাকা
অর্থোপেডিক, ট্রমা, আর্থোস্কপি অ্যান্ড আর্থোপ্লাস্টি সার্জন
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

LinkedIn
Share
WhatsApp